ফুলের গন্ধে ঘুম আসে না (২) ।। আফিফা মারজানা

আফিফা মারজানা

তিন

যার সাথে স্কুলে যেতাম, তাদের উঠোন থেকে একদিন একাকী অবহেলায় পড়ে থাকা একটা অচেনা গাছের চারা তুলে আনলাম। পরে জেনেছিলাম ওটা ছিলো নয়নতারার গাছ। মানুষ-গরু-ছাগলের পদপিষ্ট হয়ে গাছটা প্রায় মরোমরো তখন। আমি গাছটাকে ভালোবাসলাম। এতটুকুন হৃদয়ের ভালোবাসা বোধহয় গাছটা উপেক্ষা করতে পারেনি। তার যতটুকু প্রাণশক্তি ছিলো, তা-ই দিয়ে সে সাড়া দিলো। ধীরে ধীরে বেঁচে উঠতে লাগলো।  আমিও নিয়মিত যত্ন  করতাম। আর গাঁদা গাছের যত্ন  তো আছেই। মরা ডাল কাঁচি দিয়ে ছেঁটে দেওয়া, ছাগলের হাত থেকে বাঁচাতে বেড়া দেওয়া—এসবও তো আছেই। তারপরেও একটা ছাগল একদিন গাঁদা ফুলেদের ওপর হামলা চালিয়ে বেশ দুমড়ে দিয়েছিলো গাছগুলো।

সবচেয়ে কষ্টকর ছিলো মানুষের হাত থেকে ফুলেদের বাঁচানো। আশপাশের আমার বয়সী ছেলেমেয়েরা সুযোগ পেলেই ফুল চুরি করে। নিয়ে ছিড়ে ফেলে দিতো! অনেক সময় বড়রাও ছিঁড়তো, গন্ধ শুঁকবেন বলে! খুব খারাপ লাগতো তখন। তবু হাসিহাসি মুখ করে বলতাম, জি আচ্ছা, নেন। কেউ কেউ তো বলাটলার ধার ধারতো না, মন চেয়েছে তো ছিড়েছে! তার মনের খায়েশ মেটাতে গিয়ে যে আরেকটা মন ভেঙে যাচ্ছে, সে দেখার চোখ তার ছিলো না। দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষেরই নেই।

আমাদের স্কুলটা যেমন ছিলো বিশাল, তেমন তার সবকিছুই ছিলো বিশাল-বিশাল। বিরাট একটা পুকুর, তারও চেয়ে বড় মাঠ। মাঠের ধার ঘেঁষে সাজানো ফুলবাগান। জানুয়ারিতে সে বাগানে কসমস ডালিয়া আর গোলাপের সমাহারে সারাদিন প্রজাপতির নাচন। মাঠের চারধারে জবা আর নানা ফুলের গাছ। পুকুরপাড়ে একটা কাঠগোলাপের গাছ ফুল দেয়, ছায়া দেয়। আর এক কোণে একটা বকুল কেবল কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পা রাখবে-রাখবে ভাব।  আরো সব বাহারি গাছ। এক কোণে দশ-বারোটা শাল গাছ আঁধার করে রেখেছে তার আশপাশ। এক বিল্ডিংয়ের পেছনে একটা বৃদ্ধ জামের গাছ ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছে । ওদিকে কেউ ভুলেও পা দেয় না। স্কুলটা আগে একটা জমিদারবাড়ি ছিলো। তখন তক সে জমিদা্রি গাম্ভীর্য  বজায় ছিলো, এখন আর নেই বোধহয়। মুক্তিযুদ্ধকালে স্কুলটা ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের হেডকোয়ার্টার, ১১ নম্বর সেক্টরের।

অই অতটুকু কেজি স্কুলের ঘেরাটোপ ছেড়ে বেরিয়ে আসা—আমার তখন ঘোর লেগে গেলো। স্কুলে যাওয়ার কোনো কামাই নেই। শীতের দিনেও গিয়ে পুকুরে পা ডুবিয়ে বসে থাকি, ব্যাঙাচি নিয়ে খেলি।  ফুলবাগানের লোহার রডের বেড়ায় কপাল ঠেকিয়ে কপালে দাগ পড়িয়েও মুগ্ধ চোখে চেয়ে থাকি, টিফিন টাইম পেরিয়ে যায় প্রায়ই।  ম্যাডামের বকা শুনি। কুড়িয়ে পাওয়া কাঠগোলাপ কাগজে মুড়ে সযতনে রেখে দিই স্কুলব্যাগে।

বসন্তে স্কুল ছুটির পর হাত-পা ছড়িয়ে মাঠে বসে থাকি সারাটা বিকেল। ঘাসফুলের মালা গাঁথি। গল্পের বইয়ে ডুব দিই। আমার পড়ালেখা শিঁকেয় ওঠে। বর্ষা এসে যায়। বকুল ফোটে। তিন হাজার মেয়ের নজর ওই বকুলের তলায় লেপ্টে থাকতো যেন। পুচঁকে আমি যুদ্ধ করে যে কটা ফুল জোগাড় করতে পারতাম, তা-ই গনিমত ভেবে যতন করে রেখে দিতাম বইয়ের ভাঁজে। বাসায় আমার ফুলভিটে তত দিনে ভরে উঠেছে বাহারি সব পাতাবাহারে। স্কুল যাতায়াত সূত্রে আমার ফুল আর বইয়ের জোগান বাড়ে।  গাঁদার ঝাড় বুড়িয়ে গেছে, তবু আমার যত্নের কমতি নেই। নয়নতারা ডাগর হয়ে উঠেছে তত দিনে। ছোট্ট ফুলভিটে আমার হৃদয়ের অংশ হয়ে থাকে। স্কুলে রচনায় ‘আমার শখ’ রচনায় ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে লিখে ফেলি সেই ফুলবাগানের গল্প।

এক রোদতপ্ত দুপুরে পাড়ার ছানাপোনারা বাঁশবাগানে বকের ছানা দেখতে গিয়েছিলাম দলবেঁধে। ঝোপঝাড় পেরিয়ে কাদাপানি ডিঙিয়ে বাগানে গিয়ে বকের মতো গলা লম্বা করেও কিছু দেখতে পেলাম না মাটিতে কয়েকটা গর্ত ছাড়া। দলের বড়রা বললো, ওগুলোই নাকি বকের বাসা। আপাতত বকের বাসা দেখাকেই অভিযানের সাফল্য ধরে নিয়ে ফিরতিপথ ধরা হলো—বকের ছানা দেখিনি তো কী হয়েছে, বকের বাসা তো দেখেছি, সেইবা কম কিসে!  সেই বকের বাসা দেখে ফেরার পথে আমি পিছে পড়ে গেলাম। ছোট্ট নালার পাড় ঘেঁষে নাম-না-জানা এক গাছের তলায় লাল লাল বকুলের মতো অসংখ্য ফুল ছড়িয়ে আছে। আমি হাঁটু গেড়ে জামার কোঁচড় ভরে ফেললাম সে ফুলে। তারপর নালা টপকাতে গিয়ে হাত ফসকে সে ফুল ভেসে গেলো নালার জলে। আমার ভীষণ কান্না পেলো তখন। সে ছিলো হিজল ফুলের গাছ!—পরে জেনেছিলাম। প্রায়ই যেতাম সে গাছের তলায়—একা; যেতে একটু ভয় ভয় লাগত জ্বিনের, তবু যেতাম…

আজ—এখনও মনে হয়, সে বনবাদারে সেই হিজল গাছের ছায়ায় গিয়ে একদুপুর বসার বদলায় আমি এক বছরের আয়ু দিয়ে দিতে রাজি। কিন্তু সে বাদার নেই, সে হিজল নেই, নেই কিছুই। হিজলের সমাধি গড়ে সেখানে রচিত হয়েছে মন্ত্রী মহোদয়ের প্রাসোদোপম ভবন। ক্ষমতার কুৎসিত মহড়ায় সে হিজল বন বিস্মৃত কালের অতলে। আমার হৃদয়ে শৈশবের সে ঝাপসা স্মৃতি রয়ে গেছে তবু—সে মুছবার নয় কোনোদিন। আচ্ছা,  হিজল গাছ এ জমানায় কজন চেনে?

চার

আমার সোনারঙা শৈশবের বছরের তিন ভাগের এক ভাগ কাটতো গ্রামে। অজপাড়াগাঁ। গাঁয়ের  পথের ধারে ফুটে থাকা অচেনা নাম-না-জানা ফুলেদের সৌন্দর্য এখনও আমার চোখে লেগে আছে। রঙধনুরাঙা বর্ণিল সেই সব ঘাসফুল, বুনোফুল আমার হৃদয় আজও রাঙিয়ে রেখেছে যেন। সকালে গন্ধরাজ গাছগুলো ফুলে ফুলে সাদা হয়ে থাকতো। শুভ্র সে ফুলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে বেড়াত বাতাসে। ঝুমকো জবা আর রক্তজবার মাঝে কোনটা বেশি সুন্দর, তা নিয়ে এখন পযর্ন্ত আমার সন্দেহ কাটে না।

গ্রামের অনিন্দ্য সুন্দর একটা ফুল—কলমিফুল। হালকা বেগুনি এই ফুল যে মোহনীয় রূপ ধারণ করে, তা আমার ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা নেই। পানির ওপর ভাসতে থাকা কলমির ডগায় হাসতে থাকা কলমিফুলের প্রেমে আমি এখনও পড়ি বারবার। কিংবা পথের দুধারে গাছকলমির ঝাড়ে অসংখ্য অগণিত কলমি যখন ডালিতে সাজিয়ে মাথা দোলায়, কঠিন হৃদয়ের মানুষের গতিও শ্লথ হয়ে যায়। সৃষ্টি যদি এতো মোহনীয় হয়, স্রষ্টার যে কী রূপ!

বড় বড় পুকুর জুড়ে কচুরিপানার শরীর ভেদ করে বেগুনির উপর সাদা চোখের কচুরিফুলেদের আমি চোখ বন্ধ করলেই এখনও দেখতে পাই। কচুরিফুল দেখলে আমার কেন জানি ময়ূরের পালকের কথা মনে পড়ে। আমার স্কুলের পেছনের জানালা দিয়ে একটা মঁজা পুকুর দেখা যেতো। সারা বছর বিরক্তিকর কালো জলের বুকে যখন বেগুনি সে ফুলের সমারোহ বসতো, তখন সবাই সেদিকে ফিরে ফিরে চাইতো যেন। আমি আজীবন শেষ বেঞ্চের ছাত্রী, অবাক হয়ে দেখে যেতাম সে অপরূপ সুন্দর!

আমার ফুলশৈশবের অনেকখানি অধিকার করে আছে শাপলার ফুল। আজ শাপলা-তরকারি-বেচা মহিলা যখন পনেরো টাকার শাপলা পঁচিশ টাকা চাইতে আমি রাজি হয়ে গেলাম দেখে বেশ ঠকিয়েছে  ভেবে খুশি হচ্ছিল, আমি তাকে তিরিশ টাকা দিয়ে বেশ জিতলাম ভেবে শাপলা নিয়ে এলাম। হতবাক মহিলা কী করে বুঝবে এ কেবল শাপলার তরকারি নয়, এ আমার এক টুকরো শৈশব!  ভাদ্র মাসে দিগন্তবিস্তৃত  ফসলের মাঠগুলো যেন হয়ে যেতো কূলহারা নদী। সে নদীর বুকে ফুটে থাকা রাশি রাশি শাপলার হাসিতে কী আকর্ষণ ছিলো সে শিশুমনে, তা আমি এখনও বুঝতে পারি না।

ছোট ডিঙি নৌকা বা বাশঁ-কলাগাছের ভেলা ভাসিয়ে আমরা যেন সমুদ্র-বিজয়ে নেমে পড়তাম। বাঘসম ভীতিকর জোঁকের আতঙ্কে সিঁটিয়ে থাকা মন শাপলার টানে ভুলে যেতো সব। নারকোলের মালায় করে নিয়ে যাওয়া লবণ আর আল্লাহর নাম ভরসা করে বেরিয়ে পড়া হতো শাপলা-অভিযানে। থৈ থৈ পানিতে হাত ডুবিয়ে  শাপলা টেনে টেনে তুলে আনার ভেতর যে কী উল্লাস ছিলো, তা এখন আর কোথাও নেই।

তারপর বেলা কাটিয়ে যখন ফিরতাম, তখন কারও পা কেটে গেছে শামুকে, সাঁতার-না-জানা কেউ পানিতে পড়ে নাকানিচুবানি খেয়ে চোখ লাল করে ফেলেছে, কম বেশি সবাই জোঁকের চুম্বনে সিক্ত। হয়তো নৌকার বৈঠা ভেসে গেছে, ভেলার বাঁধন খুলে গেছে। ক্লান্ত বিধ্বস্ত সাত থেকে দশ বছর বয়সী একদল যোদ্ধা তবু পাটাতনে জড়ো হওয়া শাপলার স্তূপ দেখে হৃদয়ে এক ধরনের গর্বিত জয় অনুভব করতো। শালুকগুলো একপাশে আলাদা করে রাখা, পুড়িয়ে খাওয়া হবে বলে।

তারপর সারাটা বিকেল শাপলার ডাঁটা দিয়ে মালা বানানো। ফুলটা লকেটের মতো করে মাঝখানে ঝুলে থাকতো। সে মালা জড়িয়েই ঘুমিয়ে যেতাম সন্ধ্যে হতেই। হয়তো ঘুমের ঘোরে টান লেগে ছিড়ে যেতো একসময় আমার সাধের মালাও…

(চলবে…)

লেখক : অপরাজিতা-সম্পাদক ও গল্পকার