কাশ্মির-বৃত্তান্ত (১) ।। হুজাইফা মাহমুদ

হুজাইফা মাহমুদ

কাশ্মির যাওয়ার উপযুক্ত সিজন এটা না। উপযুক্ত সিজন ছিলো গেলো আগস্টে, যখন আমরা যাওয়ার প্ল্যান করেছিলাম, তখন। কিন্তু কপালের ফেরে পড়ে তখন সেটা হয়নি। এই অফসিজনে এসে মাথায় আবার সেই রোখ চেপে বসলো—যেতেই হবে, যেভাবেই হোক! অনসিজন আর অফসিজনের কেয়ার আমি কখনোই করিনি। গত সপ্তায় হঠাৎ করেই একজনকে প্রস্তাব করলাম, চলেন, কাশ্মির যাই! ভাবখানা এমন, যেন দশ টাকা অটো-ভাড়া দিয়েই চলে যাওয়া যায় কাশ্মিরে। ওই বেচারাও সামান্য দ্বিমত না করেই রাজি হয়ে গেলো। আরও কয়েকজন সঙ্গী হলে ভালো হবে, এই ভেবে আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, অ্যাই, তুমি যাইবা, তুমি যাইবা? সকলেই যেতে রাজি, যাকে বলে একপায়ে খাড়া। এভাবে চারজন হয়ে গেলো লহমায়। আনুমানিক একটা অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হলো। সিদ্ধান্ত হলো, যতটা কম খরচ করা যায়, ততটাই মঙ্গল আমাদের জন্য; এজন্য সব ধরনের কষ্ট স্বীকার করে নিতেও রাজি থাকবো আমরা। নির্ধারিত অঙ্কের টাকা কারও কাছে ছিলো আগে থেকেই, কারও কাছে ছিলো না। যাদের ছিলো না, তারা ঝটপট ধার-কর্জ করে একদম তৈরি!তারিখ পড়লো পরিকল্পনার দুইদিন পরেই। যেন তর সইছেনা কারও!—আমাদের বহু দিনের স্বপ্ন,আকাঙ্ক্ষা আর আবেগ জড়িয়ে আছে এই একটি জায়গার সাথে…

সোমবার সন্ধ্যায় সাহারানপুর থেকে জম্মুর ট্রেনে চেপে বসলাম। জেনারেল ডাব্বা। মন চাইলে টিকেট কাটবেন, না চাইলে নাই, এতে কিছু যায় আসে না। আমরা অবশ্য টিককেট কেটেছিলাম। সাহারানপুর থেকে জম্মু, প্রায় দশ ঘণ্টার সফর। এই নাতিদীর্ঘ সময় আমরা গল্প করে, মোবাইলে লুডু খেলে, চুপচাপ থেকে এবং সবশেষে বেঘোরে ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম।

জম্মু স্টেশনে পৌঁছুলাম রাত সাড়ে চারটায়! আরও ঘণ্টা-দুয়েক অপেক্ষা করতে হবে এখানে। জম্মু ঢোকার সাথে সাথে আমাদের ইউপির সিমখানা ইন্তেকাল ফরমাইলেন! জম্মু এন্ড কাশ্মিরে অন্য কোনো প্রদেশের সিম চলে না। এখানকার সিম আলাদা। নিস্পেষণে সুবিধা হয় এই সেপারেশনে। ফলে মোবাইল আমাদের কাছে থেকেও না থাকার মতোই। ক্যামেরার কাজটা করা যাবে শুধু।

ভোর হলো, আজান হলো। কাছের একটা মসজিদে নামাজ পড়লাম। চারদিক ফর্সা করে  আলো ফুটছে। ধীরে ধীরে শহরটা জেগে উঠছে। জম্মু খুব সুন্দর আর পরিপাটি একটি শহর। টিলা-টালায় ভর্তি। উঁচু-নিচু জমকালো রাস্তাগুলো খুব সুন্দর দেখায়।

আমাদের গন্তব্য শ্রীনগর। এখান থেকে তিনশো কিলোমিটার দূর। যেতে হবে বাসে অথবা সুমো ট্যাক্সিতে। বাসে খরচ কম, এজন্য আমরা বাসের উদ্দেশে রেলস্টেশন থেকে মিনিবাসে করে বাসস্ট্যান্ড যাচ্ছিলাম। যাত্রী নামানোর জন্য বাস এক জায়গায় থামলো! একদল সুমোওয়ালা যখন জানতে পারলো আমরা শ্রীনগরের যাত্রী, তখন তারা একপ্রকার জোর করেই, আটশো টাকার ভাড়া চারশো টাকায় নামিয়ে এনে তাদের গাড়িতে তুলে দিলো। এই গায়ে-পড়া জামা-ই যে আদরের হাকিকত, পরবর্তীতে তা পদে-বিপদে টের পেয়েছি।

আটজন যাত্রী নিয়ে গাড়ি ছুটলো শ্রীনগরের উদ্দেশে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শহর অতিক্রম করে গাড়ি এসে পড়লো পাহাড়ি রাস্তায়। দৈত্যাকার পাহাড়গুলির ওপার থেকে সূর্য কেবল উঁকি দিচ্ছে। চারিদিকে নরম আলোর রশ্মি ঠিকরে পড়ছে পাহাড়ের গায়। এই রাস্তার আর কোনো ইতিহাস নেই, কেবলই পাহাড়, কেবলই পাহাড়—একটার চেয়ে উঁচু আরেকটা। অনন্ত সীম এইসব পাহাড়ের যেন কোথাও কোন সমাপ্তি নেই…

জম্মু থেকে উধামপুর পর্যন্ত প্রায় ষাট কিলোমিটার রাস্তা; খুবই সুন্দর ও উপভোগ্য। কিন্তু এর পরেই শুরু হয় ভোগান্তি। পরবর্তী আড়াইশো কিলোমিটারের পুরোটাই আন্ডার-কনস্ট্রাকশন—পাহাড় কেটে ফোর লেন রাস্তা নির্মাণের কাজ চলছে। ধুলার কারণে চোখ মেলা দায়। ফলে, আপনি অসাধারণ একটি সিনিক রাস্তার কিছুই উপভোগ করতে পারবেন না। এর মাঝে আবার আছে জ্যাম। রাস্তা সংকীর্ণ হওয়ায় কিছু দূর পরপরই জ্যাম লেগে যায়। এসব কিছু না হলে এই তিনশো কিলোমিটার জার্নি আমাদের জীবনের অবিস্মরণীয় একটি রোড ট্রিপ হতে পারতো। এসব কিছুই নীরবে সয়ে নিয়ে ড্রাইভার সাহেব বেলা দেড়টার সময় বানিহাল রেলস্টেশন পর্যন্ত এসে আর সামনে এগোতে অস্বীকৃতি জানালেন! কাহিনি কী! কাহিনি হলো, আমাদের যারা জামাই-আদর দেখিয়ে গাড়িতে বসিয়েছেন, তারা মূলত গাড়ির দালাল। তারা আমাদের কাছ থেকে শ্রীনগরের ভাড়া উসুল করে ড্রাইভারকে দিয়েছেন বানিহালের ভাড়া! এজন্য এর বেশি তিনি আর যাবেন না। এখান থেকে শ্রীনগর আরও একশো কিলোমিটার দূরে। হক কথা তথাপি নৈতিক দ্বায়িত্ব হিসেবে আটজন যাত্রী মিলে তার সাথে কিছুক্ষণ বাকবিতণ্ডা করলাম এবং যথারীতি এই বিতণ্ডা নিছক সময়ক্ষেপণ বৈ অন্য কোনো ফল বয়ে আনেনি। অগত্যা এখানেই নেমে যেতে হলো। পরে বুঝেছি, এটা আসলে কুদরতের লীলা। এর মিষ্টি ফল আমরা পরে পেয়েছি অনতি বিলম্বেই…

বানিহাল রেলস্টেশন। চারপাশে উঁচু পাহাড়। মাঝখানের উপত্যকায় খুব সুন্দর, মনোরম ছোটখাটো একটি স্টেশন। এখান থেকেই কাশ্মিরের অভ্যন্তরীণ রেল-যোগাযোগ শুরু হয়েছে। আমরা এখানে দুপুরের খাবারদাবার সেরে নিয়ে শ্রীনগরের টিকেট কেটে ট্রেনের অপেক্ষায় চুপচাপ বসে আছি। এই মূহুর্তে এক যুবক এসে জানতে চাইলেন, আমরা কোথায় যাচ্ছি, কোথা থেকে এসেছি ইত্যাদি। সব শোনার পর বললেন, তার বাড়ি গুলমার্গে; আমরা যদি তার মেহমান হই, তাহলে তিনি অত্যন্ত খুশি হবেন। আমরা ভাবলাম, বাহ, এ দেখি মেঘ না চাইতেই মুষলধার বৃষ্টি! আর্থিক সঙ্গতির কথা বিবেচনা না করে  নিতান্তই দুঃসাহস করে আমরা বেরিয়ে পড়েছিলাম; যদি পয়সা খরচ করে হোটেলে থাকতে হয়, তাহলে ওখানেই আমরা ফতুর হয়ে যাবো, কাশ্মির আর দেখা হবে না—এটা ভেবে যখন বারবার আতঙ্কিত বোধ করছিলাম, ঠিক তখনই এহেন সাদর আমন্ত্রণ কতটা স্বস্তিদায়ক, সেটা বলাই বাহুল্য। আমরা  তৎক্ষণাত কৃতজ্ঞ চিত্তে তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করলাম। তিনি তার ফোননাম্বার দিয়ে বললেন, শ্রীনগর নেমে যেন তার সাথে যোগাযোগ করি।

পুনরায় বসে আছি ট্রেনের অপেক্ষায়। ট্রেন আসবে তিনটায়। এবার এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। তার সাথে আট-নয় বছরের একটি উজ্জ্বল শিশু। তিনিও যথারীতি সব কিছু জিজ্ঞেস করে জানলেন, আমরা দারুল উলুমের ছাত্র, শুনে খুবই আপ্লুত হলেন। বললেন, এখন থেকেই আমরা তার মেহমান হয়ে গেছি। তার বাড়ি শ্রীনগরেই—হজরতবাল দরগা থেকে সামান্য দূর গুলশানাবাদে। তার সাথে যখন এসব কথাবার্তা চলছিলো, তখন এক মৌলানা সাহেব এসে আমাকে একটু দূরে ডেকে নিয়ে গেলেন। আমরা দারুল উলুমের ছাত্র জেনে খুশিতে আত্মহারা। তারপর পূর্বোক্ত দুই কাহিনিরই পুনরাবৃত্তি ঘটলো! ওই ভদ্রলোকের দিকে ইশারা করে বললেন, উনি যেখানে থাকেন, সেটা তো অনেক দূর হয়ে যায়, আপনাদের জন্য কষ্টকর হয়ে যাবে সেটা। আমার সাথে চলুন, আমি একদম শহরেই থাকি, আপনাদের জন্য সুবিধাজনক হবে সেটা!

আমরা হতভম্ব হয়ে আছি! কী ঘটে চলেছে, এর কিছুই বুঝতে পারছি না! অকল্পনীয়, অভাবনীয়, স্বপ্নের মতো  মনে হচ্ছে সব কিছু! এটা সত্য কথা, দুইশো কিলোমিটার ধূলিময় পথ পাড়ি দিয়ে আসার কারনে আমাদের চেহারা-সুরত আর কাপড়ের দিকে তাকানো যাচ্ছিলো না। একেবারে শোচনীয় অবস্থা! তাই বলে কি এতটাই অসহায় আর করুণ দেখাচ্ছে আমাদের, যে, সকল মানবিক মনের অধিকারী মানুষের হৃদয়ে আমরা দয়া ও করুণার ঝড় তুলে দিচ্ছি! কাহিনি সেরকম কিছু যে নয়, সেটা টের পেলাম সফরের বাকি দিনগুলোতে।

আমরা সকলের নিমন্ত্রণই গ্রহন করেছি, কাউকে না বলিনি। ট্রেন আসলো যথাসময়ে। ডাউন টাউনের ডামি ট্রেন! এই পরিবেশে ট্রেনটাকে যে কী সুন্দর লাগছিলো! আমরা উঠলাম। আমি ভাবছিলাম, চারদিকেই তো পাহাড় দেখছি, ট্রেন বেরুবে কোন দিক দিয়ে! এই ভাবনার মাঝখানেই ট্রেনটি একটি টানেলের ভেতর ঢুকে পড়লো। পাহাড়ের পেট চিরে বানানো হয়েছে বারো কিলোমিটার দীর্ঘ—পৃথিবীর সর্ববৃহৎ—রেল-টানেল! নয় কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি রোড-টানেল আমরা পেরিয়ে এসেছি জম্মু রোডে, সেটা ছিলো এশিয়ার সর্ববৃহৎ রোড-টানেল।

বানিহাল থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত পুরোটাই সমতল ভূমি। দুইপাশে ধানখেত, ফসল তোলা শেষ। সোনাবর্ণ ফসলের চিহ্ন পড়ে আছে সব দিকে। বহু দিন পর এমন অবারিত ধানি জমিন দেখে আমার বাঙালি মন ভাবানন্দে দুলে উঠলো। কখনো রাস্তার দুই পাশেই উঁচু বার্চ বন। হলুদ পাতায় ভরে আছে মাঠ। তাতে শেষ বিকেলের নম্র আলোটুকু এসে গড়িয়ে পড়ছে।

শ্রীনগর পৌঁছুলাম বিকাল পাঁচটায়। সূর্যের তেজ ততক্ষণে কমে গেছে। চারদিকে নির্জন। হালকা শীত পড়ছে। স্টেশনে নেমে আমরা যখন অপশন ঠিক করছিলাম, মেজবান হিসেবে কাকে গ্রহন করা যায়, তখন ওই মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক এগিয়ে আসলেন আমাদের দিকে। কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বললেন, চলুন আমার সাথে, আমরাও কোনো দ্বিরুক্তি না করে তার অনুগত হয়ে গেলাম।

স্টেশন থেকে মোটামুটি ভালোই দূরে তার বাড়ি। মাঝে ডাল গেটে আমাদেরকে বসিয়ে রেখে তিনি গেলেন বাজার-সদাই করতে। বাড়িতে মেহমান যাচ্ছে! সন্ধ্যার ওই আধাঘণ্টা সময় আমরা ডাল লেকে কাটালাম। এই তো সেই ডাল, কত গল্প, কত কাহিনি শুনেছি এর নামে—দূরবর্তী স্বপ্নের মতো ছিলো একদা, এখন এর পানিতে পা ডুবিয়ে বসে আছি! শিকারাগুলোর রঙিন বাতি জ্বলে উঠছে ধীরে ধীরে। এখনো সব কিছু স্বপ্নের মতোই লাগছে। এক শিকারাওয়ালার সাথে বেশ জমে উঠছিলো গল্প…

(চলবে…)

লেখক : আলেম, কবি ও ক্রিটিক