ইতস্তত কৈশোরের আলাপ

আহসান জাইফ

 একটা ছবি চোখে ভাসে। বিশ-তিরিশ বছর আগে, ফুলপাতার ডিজাইনের জানালার চল ছিল। সকালবেলার সোনালি রোদ সেই কারুকার্যময় ফুলের ভাজে ভাজে লেপ্টে গিয়ে ঘরটাকে এক অন্যধরনের আলো অন্ধকারের আমেজ দিয়েছে। সকালবেলার ঘ্রাণ, আলোর এক আশ্চর্য বিরাজমানতার ভিতর একটা বিচূর্ণ আয়নায় আমি তাকিয়ে আছি একদৃষ্টিতে—লাল টুপি মাথায়, ঘাড় হালকা কাত করে সরল চিবুক বরাবর ভাঙা আয়নার মুখোমুখি,—এই ছবিটুকু আমি কিছুতেই ভুলতে পারিনা। কোনো ফোটোগ্রাফ না, অন্য কারও উপস্থিতিতে না, এই পৃথিবীতে আমিই একলা পুষে রেখেছি এই দুর্দান্ত ছবি,—যেখানে জগতের সকল আলাপ, কালপ্রবাহ, অন্যমনস্ক কন্ঠস্বর ঠেকে গিয়ে সামগ্রিক জীবনকে এই বিন্দুতে নিশ্চিহ্ন করে দিচ্ছে; আর আপনি ইতিমধ্যে জেনে গেছেন যে, এই এহসাসকে আপনি কোন শব্দের চক্রে ব্যখ্যা করতে পারবেন না।

আমার সমস্ত শৈশবকে আমি এই স্মৃতির ভেতর দেখে উঠি :—একটা বালক, তার মাথায় টুপি, সে মসজিদে যাবে; কোনো এক কারণে সে আয়নায় বড় গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, আর আল্লাহ তার কলবে এই মুহূর্তকে আজীবনের জন্য বাঁধাই করে দিলেন; আমার সমস্ত সংবেদন এই ছবির সময়কে গভীরভাবে অনুভব করে। আমার নিজেকে দেখে ওঠার চেষ্টা, সেই চেষ্টার মুহূর্ত আমার স্মৃতির ভেতর গেঁথে থাকা, কোনো রাত্রিতে হঠাৎ সেই দুর্দান্ত ছবির ভেতর আমার ফেলে আসা দিনগুলোকে রাখি,—ছবিটা আমার ফিতরত বোঝায়, যার শায়েরিকে ধারণ করে আমি নিজেকে দেখছি। আমি সেই ফিতরতকে কীভাবে ভাবলাম, বিচ্যুতি আর চোখ-ধাঁধানো গোলকধাঁধার ভেতরে আমি এক বালক, ইতস্তত পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়েছি; আমার ভেতরে জেগে-ওঠা ফিতরতের ডাককে উপেক্ষা করতে না-পারার চাপ, সত্য-অসত্যের মামলা ঝুলিয়েছি দর্শন, নির্দিষ্ট চিন্তাপ্রভাবিত শিল্পের ঘরানায়—আঁকড়ে কাছে টানা ফ্যান্টাসি; নেতির প্রলয়ংকরী স্বাদ,ইলিউশান, কবিতা, অধুনা জীবন-এপ্রোচ, একটানা ছন্দপতনের মতো কাঁপিয়ে দেওয়া অস্থির তবুও ইতস্তত সময়কাল।

চেহরা-স্পর্শ-করা বাবার দীর্ঘশ্বাস, দাঁতচাপা বেদনা আর পারস্পরিক বন্ধনকে ঘিরে অস্থিরতা, নিজের অস্তিত্বের অংশীদারের হেদায়াতের জন্যে তড়পানো জীবন। এত্ত এত্ত অস্থিরতা, সংশয় প্রশ্ন, নিজেকে মেরে ফেলার বোধ—আর বড় ধীরে ধীরে, কোনো ট্রাজেডির আকারে না। বড় ইতস্তত নজরে আবার ঐতিহ্যকে পুনঃপাঠ, মানবের জ্ঞানপদ্ধতিকে প্রশ্ন করার হিম্মত, সেকুলার রাজনৈতিকতার সংকটের খোঁজ আর ওয়াজিবুল উজুদের মারেফাতের গন্তব্যের দুয়ার নেড়ে দেখা—

—সেটা, যেটা ছিল বড় পুরোনো আর মরচে-পড়া বন্ধন,—আমার রব সেই বন্ধনের শেকলে হ্যাঁচকা টান দিলেন, আমার সমগ্র সচেতন কর্তাসত্তা, ইগো, ছিটকে বেরিয়ে এল ক্রমশ। স্থিরতা আর অনন্ততার পথে যেতে বহু পথ বাকি। এ হলো যাত্রাবিরতির গল্প। তফাত কেবল এই যে, সে রাস্তা চিনে গেছে। তবুও অতীত আর এই সময়েও সে বিভিন্ন জিজ্ঞাসার ভেতর তীব্র ছটফট তবু ইতস্তত এক দ্বান্দ্বিক কলবের কিশোর—তাই গল্পটা ইতস্তত যাত্রার পথিমধ্যে, কৈশোরের অস্থির ইতস্ততার…

(  চলবে )

লেখক : ছাত্র, জামিয়া আযমিয়া দারুল উলুম, ঢাকা