হেফাজতের ‘অরাজনৈতিক রাজনীতি’ ও সুশীল সমাজের গলদ

তুহিন খান

ভণিতা

ডেটলাইন ৫ মে, ২০১৩। হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে দেশব্যাপী চলছে ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচী। কেন, কীভাবে, কোন প্রেক্ষাপটে এই কর্মসূচী, তা পুরানা আলাপ। সেই আলাপ আমাদের এই লেখায় সরাসরি আসবে না, নেপথ্যে থাকবে। দিনব্যাপী সফল কর্মসূচীর পর, সেদিন রাতে, মতিঝিলের শাপলা চত্ত্বরে রাতব্যাপী অবস্থান কর্মসূচী ঘোষণা করে তারা। ইতিমধ্যেই বিরোধীদল বিএনপি-জামায়াত জোট এই কর্মসূচীতে তাদের সমর্থন জানিয়েছে। বাঙলাদেশের রাজধানী ঢাকা আক্ষরিক অর্থেই সেদিন অচলায়তন। এই অবস্থায়, ক্ষমতাসীন আওয়ামী সরকারের নির্দেশে র‌্যাব-পুলিশ-বিজিবির নেতৃত্বে, মধ্যরাতে শুরু হয় ‘অপারেশন ফ্লাশআউট’। ভোর নাগাদ মতিঝিলের শাপলা চত্ত্বরে অবস্থানরত হাজার-হাজার মানুশ—যাদের মধ্যে কওমি মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকেরাই ছিলেন সংখ্যাগুরু—ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। হেফাজতের পক্ষ থেকে কয়েক হাজার মানুশ হতাহতের কথা বলা হয়। সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে নানারকম খবর। সরকারের পক্ষ থেকে কোন রকম হতাহতের ঘটনার কথা অস্বীকার করা হয়। বাঙলাদেশের কওমি মাদ্রাসা কম্যুনিটির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক আতঙ্ক, হতাশা, ক্ষোভ ও মানসিক দ্রোহ। ৫ মে-র সেই ঘটনার মধ্য দিয়ে বাঙলাদেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী, যাদের আমরা বলছি কওমি মাদ্রাসা কম্যুনিটি, তারা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্যাসিভনেস থেকে বেরিয়ে দেশের রাজনীতিতে অন্যতম প্রধান আলাপের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়।

সুশীল সমাজের ‘কওমি’ আবিষ্কারের গলদ

বাঙলাদেশে ‘সুশীল সমাজ’ নামে যে গোষ্ঠীটি এখন বর্তমান আছে, এরা মূলত মুসলিম লীগ-উগ্র বাম-ক্যালকেশিয়ান সাংস্কৃতিক ধারা—এই সবকিছুর একটা ব্লেন্ড। একাত্তর-পরবর্তী সময়ে এরা এদেশের সামাজিক অবকাঠামোর পুনর্গঠনে ব্যর্থ হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে সামাজিক ইনসাফ কায়েমের লড়াই থেকে ইসলাম বনাম ক্যালকেশিয়ান সেক্যুলারিজমের লড়াইয়ে রুপ দেয় এরা, যা ছিল পূর্ববাঙলার গণমানুশের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা আর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার পরিপন্থী। ফল এই হয় যে, ইসলাম এবং ইসলামের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে বেড়ে ওঠা এদেশের গণমানুশের থেকে বিচ্ছিন্ন একটি পলিটিকাল ও কালচারাল এলিট গোষ্ঠীই হয়ে ওঠে এদেশের ‘সুশীল সমাজ’।

এই সুশীল সমাজটি, ফলে স্বভাবতই, এদেশের কওমি কম্যুনিটির সাথে কোন ইফেক্টিভ কম্যুনিকেশনে ব্যর্থ হয়। স্বাধীনতার পর নানা কারণে, কওমি কম্যুনিটি এদেশে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান হারায়। আশির দশকে হাফেজ্জি হুজুরের ‘খেলাফত আন্দোলন’র আগে তাদের তেমন কোন দৃশ্যমান রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা যায় নাই। ততদিনে জামায়াতে ইসলামি এদেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত শক্তি হয়ে ওঠে এবং রাজনৈতিকভাবে ইসলামপন্থার সবচে শক্তিশালী স্টেক হোল্ডার হয়ে ওঠে। আমাদের সুশীল সমাজ ফলে রাজনৈতিকভাবে ইসলামকে মোকাবেলা করা বলতে জামায়াতকে মোকাবেলা করাই বুঝতো, এবং সেই মোকাবেলার জন্য ‘যুদ্ধাপরাধ’র মত বড় একটা ইস্যু তাদের হাতে ছিলো। এই ইস্যু ধরেই, ইসলাম ও মোসলমানি যাবতীয় প্রবণতারে ‘জামায়াতে ইসলামি’ আর ‘একাত্তরের পরাজিত শক্তি’ হিশাবে চিহ্নিত করার মধ্যেই তাদের ইসলামি কম্যুনিটির সাথে ডিলিং সীমাবদ্ধ থাকে।

৯/১১ এর পরেপরে সেইসব চিন্তার একটা সফট রিফর্মেশন ঘটা শুরু হয়। এই সময়ের মধ্যে কওমি ধারার রাজনীতি বেশ সক্রিয়ই ছিলো বলা লাগবে। কিন্তু, এই সক্রিয়তা ছিলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক; সুশীল সমাজের কাছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে তাদের তেমন কোন গুরুত্ব ছিলো না, রাষ্ট্রের সাথেও এত বড় ধরণের কোন সন্ধি বা সংঘর্ষে তারা যায় নাই কখনোই। আর ফলেই, আমাদের সুশীল সমাজ এতদিন জানতেই পারেন নাই, আমাদের এই সমাজে কত বিভিন্ন ও বিচিত্ররকমের ডায়নামিক্স নিয়া এরকম একটা গোষ্ঠী স্বাধীনতার আগে থেকেই বিদ্যমান, এবং ক্রমশ বর্ধনশীল। তারা এই গোষ্ঠীটিকে ‘জঙ্গী’ আর ‘ওয়াহাবি’ সিলসিলার এক্সটেনশন ভাবতেই পছন্দ করতেন। এইটা আসলে তাদের সমাজ সম্পর্কে অজ্ঞতারই ফলাফল। আর সেজন্যেই, হেফাজতের গণবিস্ফোরণে বিস্ময়ে চোখ কপালে ওঠে এই সুশীল সমাজের।

হেফাজতের ঘটনার মধ্য দিয়া কওমি কম্যুনিটির শক্তির একটা সর্বাত্মক বিস্ফোরণ ঘটে। এই শক্তি নিছক রাজনৈতিক ব্যাপার ছিলো না, এর মধ্যে ছিলো কওমি প্রবণতার নানাদিক। কিন্তু আমাদের সুশীল সমাজ যেহেতু হেফাজতের ভেতর দিয়াই প্রথম কওমি কম্যুনিটিরে চিনলেন, জানলেন, গুরুত্বপূর্ণ ভাবলেন; ফলে তাদের কওমি কম্যুনিটিরে আবিষ্কার খণ্ডিত হয়ে থাকলো। তারা হেফাজতরে ভাবলেন নিছকই একটা ইসলামি এলায়েন্স, যারা স্বাভাবিকভাবেই ‘স্বাধীনতার চেতনা-বিরোধী’ বিএনপি-জামায়াতরে ক্ষমতায় আনার জন্য রাজপথে নামছেন। শাহবাগিদের হেফাজত-দর্শন কমবেশি এমনই ছিলো। কিন্তু এখন? এই ২০১৮ সালে এসে তারা কী তাদের সেই ভুল বুঝতে পারছেন? তারা কি ধরতে পারছেন কওমি কম্যুনিটির ভেতরের ডায়নামিক চরিত্রটি?

হেফাজতের রাজনীতি: ইতিহাসের দোহাই

হেফাজতে ইসলামের রাজনীতি এবং তার ঐতিহাসিক ‘ধরণ’ নিয়া আলাপে যাওয়া যাইতে পারে। সম্প্রতি একজন আলেম এক প্রবন্ধে লিখেছেন, আওয়ামী লীগ আলেমদের হাতে গড়া দল। আওয়ামী লীগই তাদের কদর বুঝবে। এদেশের কোন কোন ইসলামপন্থী কওমি ও দেওবন্দি সিলিসিলারে মুসলিম লীগের সূত্রে প্রো-আওয়ামী ও প্রো-কংগ্রেস বলে থাকেন। অন্যদিকে, সেক্যুলাররা কওমিদের বিজেপির মত উগ্রপন্থী এবং জামায়াতের রাজনৈতিক দর্শনের সাথে মিলিয়ে বিচার করেন। এই কন্ট্রাডিকশন কেন? এই কন্ট্রাডিকশন বুঝতে না পারলে, হেফাজতের রাজনীতি ও আওয়ামী লীগের সাথে তাদের বর্তমান সম্পর্ক বোঝা যাবে না।

একথা ঐতিহাসিক সত্য যে, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে দেওবন্দের ভূমিকা ছিল বিভক্ত। হুসাইন আহমদ মাদানি যেমন অখণ্ড ভারতের পক্ষে ছিলেন, তেমনি আশরাফ আলী থানবি ও তার শিষ্যরা পাকিস্তান আন্দোলনে সায় জানিয়েছিলেন। ফলে, সত্যেন সেন যে দেওবন্দকে সাধারণভাবে অখণ্ড ভারতের সমর্থক বলেছেন, তা যেমন ঠিক নয়; তেমনি এখন যারা বলছেন যে, তারা মুসলিম লীগের স্বাভাবিক উত্তরসূরী, সেকথাও সত্য নয়। আওয়ামী মুসলিম লীগ, আর আওয়ামী লীগ যে এক নয়, এটিও একটি বোঝার ব্যাপার। আওয়ামী লীগ মুসলিম লীগের উত্তরসূরী হলেও, তাই একথা এভাবে বলা যায় না যে, আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করেছেন আলেমরা। ইভেন মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার সাথেও কওমি আলেমদের যোগ অত গভীর ছিল না। যে দুজন আলেমের কথা বলা হচ্ছে, মাওলানা ভাসানি ও তর্কবাগিশ, কেউই দেওবন্দ বা এর সোশাল রিপ্রেজেন্টেটর ছিলেন না। দেখা যাচ্ছে, দেওবন্দ কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ, অখণ্ড ভারত বা পাকিস্তান, সবগুলোকেই একইসাথে ঔন ও রিজেক্ট করছে। তাদের সমস্যা হচ্ছে না।

স্বাধীনতার পরে আলেমদের রাজনীতির ইতিহাসও এমনই বিচিত্র। আশির দশকে হাফেজ্জি হুজুরের নেতৃত্বে আলেমরা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজনীতি করেছেন। তারপরে সময়ে সময়ে তারা দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সাথে জোটবদ্ধ হয়েছে। তারমানে, মুসলিম লীগ, কংগ্রেস বা বিজেপি—এরকম ক্যাটাগোরাইজেশনের মধ্যে তারা সীমাবদ্ধ থাকছেন না। এর কারণ কী?

এর কারণও ঐতিহাসিক। ঐতিহাসিকভাবে, উমাইয়া খেলাফতের মাঝামাঝি সময় থেকেই, আলেমরা নিজেদের পাওয়ার পলিটিক্স থেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রেখে, এলেম, জ্ঞানচর্চা এবং কালচারাল মুভমেন্টের মধ্য দিয়ে সমাজ তথা সোসাইটির সাথে মজবুত সম্পর্ক রেখে স্টেট তথা রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করতে শুরু করেন। এজন্যেই সেইসময়ে, আব্বাসি খেলাফতের শুরুর দিকে, ইমাম আবু হানিফা রহ. কাজির পদগ্রহণে অস্বীকার করলেন। এবং, নিতান্তই অ্যাকাডেমিয়ার মানুশ আহমদ ইবন হাম্বলের সাথে খলিফা মামুনের বিরোধ হলো। রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে সমাজ পরিবর্তন, না সমাজের ভেতরে থেকে রাষ্টের শুদ্ধি? এই বিতর্ক এখনও যদিও বিদ্যমান, কিন্তু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এক্ষেত্রে উমাইয়া খেলাফতের মাঝামাঝি সময় থেকেই মোটাদাগে আলেমরা দ্বিতীয়টিকে ফলো করেছেন।

একবাল আহমেদ তার ‘Islam And Politics’ নামক লেখায় এই অবস্থানের মোটাদাগে তিনটা কারণের কথা বলেছেন: এক. চার খলিফার পর থেকে হাতেগোনা কয়েকজন শাসক বাদে, কেউই তেমন ধর্মনিষ্ঠ ছিলেন না। দুই. মুসলিম রাষ্ট্রে সাধারণভাবে শরিয়াবিরোধী এবং ধরণে দুনিয়াবি অনেক আইন ইমপ্লিমেন্টেশন হয়েছে, ইসলামেরই নামে। তিন. মুসলিম রাজত্বের বিভিন্ন অংশে বিভিন্নরকম শাসনব্যবস্থা থাকলেও সমস্ত মুসলিম এক উম্মাহ এবং খেলাফতই একমাত্র ঐশী শাসনব্যবস্থা এই বিশ্বাসের কারণে আলেমরা নানারকম শাসনব্যবস্থার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলা ইসলামি রাজত্বের সময়ে সরাসরি ক্ষমতার অংশ হন নাই। বরং, প্রায় হাজার বছরের ইসলামি শাসন এবং এর আলোকে বর্তমানের মডার্ন স্টেটের ধারণাকে তারা এভাবে মেনে নিয়েছেন যে, এই ব্যবস্থায় ন্যূনতম ইসলামি নীতিমালা অনুসরণ করা লাগবে এবং জনগণের আস্থা অর্জন করা লাগবে। সরাসরি ইসলামের সাথে কন্ট্রাডিক্টোরি কোন আইন করা যাবে না। এবং এর মধ্য দিয়েই, ইসলাম-প্রশ্নে আলেমসমাজ আর রাষ্ট্রের ভেতরে রফা হয়।

একবাল আহমেদের এই তিন কারণের সাথে দ্বিমতের অনেক কারণ ও ঐতিহাসিক দলীল আমাদের কাছে আছে। তা সত্ত্বেও, একথা অনস্বীকার্য যে, ক্ষমতার সাথে একটা নিরাপদ দূরত্ব রেখে এবং মেনে নিয়ে, সামাজিক পরিবর্তন এবং সোশাল এক্সেপ্টেন্সের মধ্য দিয়ে স্টেটের সাথে ইসলাম-প্রশ্নে একটা ন্যূনতম নেগোসিয়েশনে যাওয়ার পলিসিই আলেমসমাজের বড় একটি অংশের রাজনৈতিক সক্রিয়তা ছিল, সেই উমাইয়া খেলাফতের কাল থেকেই।

এই কনটেক্সট মাথায় রেখে পাঠ করলে উপমহাদেশে আলেমদের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বোঝা যাবে, বোঝা যাবে কেন তাদেরকে একইসাথে মুসলিম লীগার আবার কংগ্রেসি বলা যায়। রাজনৈতিক হেফাজতের অরাজনৈতিক আন্দোলনের মর্ম কী, হেফাজতের ‘অরাজনৈতিক রাজনীতি’ এবং তার স্বাভাবিক ফলাফল হিশাবে আওয়ামী লীগের সাথে তাদের বর্তমান সখ্যতারও একটা হল-হদিশ এর মাধ্যমে হয়তো করা যাবে।