
আহসান জাইফ
আমার গল্পের আদতে কোনো ধারাবাহিকতা নেই। খুব হঠাৎ কোনো ছবি অথবা গল্প যদি আমাকে আচ্ছন্ন করে, তখন আমার জীবনকে আমি ততটুকুই জানি।
আমার মাদরাসা-যাপনের কিছু বলি। আমার বয়েস ১৪-১৫ হবে। ঢাকার এক মাদরাসায় আমি প্রথম বর্ষে পড়ি। ওখানকার এক হুজুর, নিজে কবি। বলা যায়, আধুনিক কবিতার ব্যাপারে ভালো ওয়াকিবহাল। ওনার রুমে বিশাল বইয়ের স্তুপ। প্রথম দিন মাদরাসায় আসার পর উনি আমাকে শরতচন্দ্রের শ্রীকান্ত বইটি পড়বার জন্য দিলেন। বলা বাহুল্য, বইটা আমি পড়ি নাই। আমার স্বাদ বেশ বদলে গেছে তত দিনে। পরীক্ষার বিরতির এক সপ্তাহে আমি বুদ্ধদেব বসুর তিথিডোর পড়ি এবং এমন নেশাগ্রস্তের মতো পড়ি যে, এই যে এখন বলছি, আমার শরীরের প্রতিটা কোষ, ইন্দ্রিয় এর আমেজকে অনুভব করছে। আমি তখন বিশ্বাসগত আলাপকে পাশ কাটিয়ে ধর্মীয় যাপন ও তার নৈতিক ব্যাপারগুলোকে ইগনোর করছি। একটা অভ্যাস ছিলো আমার, এশার নামাজের সময় রাস্তায় হাঁটান আর গভীর রাতে মাদরাসায় ফেরা। ওই সময়ে ঢাকার রাস্তার বাতিগুলো হলুদ ও ঘোলাটে থেকে ফকফকা সাদা হয়ে ওঠেনি। সেই আগেকার হলুদ লাইট ছায়ায় বিভ্রম তৈরি করতো। সেই ছায়ার বিভ্রমে দেখতাম উপন্যাসের স্বাতী আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। আমি কি একে বয়েসের ইমাজিনেশন ধরে নেব? কিন্তু এখনো আমি আবার সেই বিভ্রমের ছায়ায় স্বাতীকে আরও একবার দেখতে চাই।
আমার আর পড়া হলো না সেখানে। এক বছর বাদে চলে এলাম। মূলত মাদরাসায় পড়বার আমার কোন ইচ্ছা কিম্বা উদ্দেশ্য ছিলো না। নিতান্ত বাসার চাপ ছিলো। আমি ভর্তি হলাম শ্যামলীর আল কাউসার নামে পরিচিত মাদরাসায়। আমার জীবনের ইতিবাচক কিম্বা নেতিবাচক, যে কোনো প্রভাবের পেছনে এই মাদরাসার পরিবেশ, সহপাঠী ও শ্যামলীর উল্টো দিকে আগারগাঁওয়ের ধুলো-ওড়া প্রায় দিগন্ত ছুয়ে ফেলার উপক্রম রাস্তার প্রতিটি ধুলিকণার ভূমিকা আছে। এই গল্প বলতে ক্লান্তি বোধ হচ্ছে, মুহুর্মুহু স্মৃতির আগমনে দিশেহারা বোধ করছি…
*****
ইদানীংয়ের একটা গল্প বলি। বছর দুয়েক আগে, আমি তখন পুরোদস্তুর সংশয়ী। শাহবাগে রাত্তিরে দাঁড়িয়ে আছি। মোটামুটি বিখ্যাত এক কবির সাথে মুগ্ধ ভঙ্গিমায় আড্ডা দিচ্ছি। কথা প্রসঙ্গে উঠে আসলো মাদরাসা, হেফাজত, ধর্ম, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম…
উনি বেশ আন্তরিকতায় বোঝাচ্ছিলেন, মুহাম্মাদকে কেবল সেই সময়ের স্রেফ রাজনৈতিক নেতা হিশেবে দেখা উচিত, সফল এবং মহান রাজনৈতিক নেতা, যিনি তাঁর প্রচুর মেধা দ্বারা একটি জাতিকে সভ্য করে তুলেছেন, সেই অবদানকে তার নবী দাবি করার ‘গল্প’ ক্ষতি করতে পারে না। উনি যে নিতান্ত সাধারণ মানুষ ছিলেন, সে প্রসঙ্গে কিছু ঘটনা শোনালেন, যা আম্মাজান আয়েশা রা.-এর সাথে সম্পৃক্ত। বলবার ধরন ছিলো আপাত নজরে প্রাচ্যবিদদের ধরনে ভদ্র এবং ইঙ্গিতময়। আমি চুপচাপ শুনে গেলাম। এর প্রায় এক বছর পর, আমার সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে আব্বার সাথে প্রায় সারারাত কথা বলার পর, এই ঘটনাটা বললাম। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে, আব্বা ভীষণ আহত এক নজরে আমাকে বলছিলেন, তোর পাল্টা কিছু বলে আসার মতো ইমানি গায়রতটুকুও কাজ করলো না!
মূলত উক্ত কবির ব্যাখ্যার জায়গায় আমার সংশয়ী মনেও দ্বিমত ছিলো। একাডেমিকলি সিরাহ পাঠের ফলে ব্যাখ্যার গলদগুলোও ছিল স্পষ্ট। কিন্তু তবুও কেন বলি নাই! সংশয়? কবির সান্নিধ্য? আশপাশের তরুণীদের শ্লেষের ডর? আমি বলতে পারি নাই। আমাকে ঘিরে রেখেছে একরাশ কবি-কবি সুখানুভূতি, নারীবিষয়ক আগ্রহী উপাদান, আর আর সংশয়, জিজ্ঞাসা, ঔদ্ধত্য।
আজকের আলাপগুলো ছিলো এলোমেলো, নিম্নমুখী, নতজানু বোধ আর এক অন্তিম এহসাসের যাত্রার পথিমধ্যে হতাশা আর টানাপোড়েনের গল্প। আমি ভাবি, কতই না গল্প মানুষের! এই অপার্থিব বোধ-সকলকে আমরা পাই গান, সিনেমায়, কবিতায়। এই যে আমার সামনে বাজছে প্যাসেঞ্জারের ঘরে ফিরে আসার গান, এও এক গল্প, বোধ। আমরা একে ব্যাখ্যা করতে পারছি না। আমাদের গল্পগুলা কিম্বা বোধসমূহের আদতে কোনো ধারাবাহিকতা নেই। কোনো ছবি বা গল্প যখন আমাদের আচ্ছন্ন করে, আমরা তাদের ঠিক ততটুকু জানি।
(চলবে…)
লেখক : গদ্যকার
আগের কিস্তিগুলো
প্রথম কিস্তি ঃ ইতস্তত কৈশোরের আলাপ
দ্বিতীয় কিস্তি ঃ ইতস্তত কৈশোরের আলাপ ( ২)
