ইতস্তত কৈশোরের আলাপ (২) ।। আহসান জাইফ

আহসান জাইফ

বইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় সাত কিম্বা আট বছর বয়েসে—বইমেলায় কমিকস জাতীয় কিছু কিনে এনেছিলাম। মনে আছে, লোডশেডিংয়ের ভেতরে আমি সেই ছবিওয়ালা বই পড়ছি, আর মনে হচ্ছে মোমবাতির আলোয় ছবিগুলো সব অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে, অন্য চরিত্রে রূপান্তরিত হচ্ছে।

আমি বড় হয়েছি যৌথ পরিবারে এবং তখনো আমার বাসায় আমি ছাড়া ভিন্ন কোনো সন্তান ছিলো না কারও। আমার মনে পড়ে, খুব সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমি সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাচ্ছি দোতলায়—দাদুর বাসায়। যে রুমে সবচে বেশি আলো আসে, সে রুমে গিয়ে বসছি। পাখির ডাক, সদ্য জাগ্রত হওয়া মানুষের কোমল কলরব, বাসার কেউ তিলাওয়াত করছে, দাদার রুমে মৃদু জিকিরের শব্দ ইত্যাদির আমেজের ভেতরে আমি শুয়ে থাকতাম বিছানায়। এখনো খুব সকালে ওই রুমে বসতে চেষ্টা করি। কত তফাত! পাখিও ডাকেনা,বয়েসের প্রভাবে দাদার জিকির আর কানে বাজে না,এখন আর তিলাওয়াত করবার কেউ নেই। কত কিছু পালটায়! বয়েস, বোধ, বাস্তবতা, প্রিয়জনের প্রস্থান! তবু কিছু ছবি থেকে যায়।

আমার চাচার রুমে ছিল অগণিত বইয়ের স্তুপ। একটা বয়েস পর্যন্ত সেই বইগুলোর সামনে অগাধ বিস্ময়ে দাঁড়াতাম। আমার ন বছর বয়েসে আমি হঠাৎই পড়তে শুরু করি সেবা প্রকাশনী-র তিন গোয়েন্দা নামক সিরিজ। মজার বিষয় হলো, বইটা আমি পড়ছিলাম গোপনে; কারণ আমার কাছে সুস্পষ্ট না। খুব সম্ভব তিন গোয়েন্দার বইতে পশ্চিমের লোকেদের চেহারার ছবি ছিলো,  আর কী করে যেন এই পশ্চিমি চেহারার প্রতি গোপন নিষিদ্ধতা তৈরি হয়েছে অবচেতনে আমার মনে, এটা হয়তো তারই প্রতিক্রিয়া। বয়েস কম, অনেক অপরিচিত শব্দ ও ঘটনার পূর্বাপর না বুঝেই শেষ করলাম, কিন্তু জারি রাখলাম পড়া।

ধীরে ধীরে প্রায় শখানেক ভলিউম শেষ করে যখন উঠলাম, তখন আমার বয়স এগারোর কাছাকাছি। আমি পড়তে লাগলাম জাফর ইকবালের কিশোর উপন্যাসসমূহ; এবং মজার কথা হচ্ছে, একই সাথে হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন পড়াকে  অকালপক্বতা হিসেবে বিবেচিত করা হলো বাসায়। তবুও গোপনে আমি পড়তে লাগলাম এবং ধীরে ধীরে অনেক নিষিদ্ধতা আকারে প্রকৃতির প্রাণ-বৈশিষ্ট্যের মৌলিক আলাপের কিঞ্চিৎ দুশ্চিন্তা বলুন কিংবা উৎসাহ, আমার মাথায় কাজ করতে লাগলো।

আসলে হুমায়ূন আর জাফর ইকবাল একসাথে পড়তাম, কথাটা পুরোপুরি ঠিক না। একটু পরে হুমায়ূন পড়ি; কেননা আমার মনে আছে, যখন হুমায়ূন পড়ছি, প্রায় নেশাগ্রস্তের মতো পড়ছি! সেইভাবে বলা যায়, শিশুতোষ কিম্বা  কিশোর-উপন্যাস আমার খুব একটা পড়া হয় নাই। বাড়ির লোকজন মৌলিকভাবেই বই পড়ার উৎসাহ দিলেও পাঠ্য রুচিকে অকালপক্বতা হিসেবে বিবেচনা করলেন।

আমি হঠাৎ করে লেখা শুরু করলাম আবার। কী করে লেখার আগ্রহ তৈরি হলো, এটার একটা সহজ জবাব হচ্ছে, আমাদের বাসায় লোকজন প্রায় সবারই সাংস্কৃতিক রুচিবোধ বেশ প্রখর ছিলো। ধর্মীয় পরিবারে তৎকালীন সময়ে জামায়াতে ইসলামীর চিন্তায় প্রভাবিত লোকজন ছাড়া কেউই তেমন এসব বিষয়ে সচেতন ছিলো না। আমরা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ধারার অনুসারী হিসেবে আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের একটা গৎবাঁধা ছক ছিলো, তবু  উদ্দীপনা ও  মৌলিকতা ছিলো। সেই সময়ে আব্বার কাছে আবৃত্তির কিছু ঢং ও ভঙ্গিমা  শিখি। নজরুলের বিদ্রোহী কবিতাটা পুরোটা মুখস্ত করেছিলাম। একধরনের এলোমেলো সময় ছিলো, যা পাচ্ছি, পড়ছি!

বারো-তেরো বছর বয়েসেই আমার ধর্মীয় সমাজের প্রতি একটি  বিশেষ নজরিয়াত তৈরি হলো। মতাদর্শিক অবস্থান ইত্যাদি বোঝার যোগ্যতা না হলেও একটি ভিন্ন চশমায় আমি আমার পরিবার ও মাদরাসার হুজুরদের দেখতে শুরু করলাম। আমি যেন তাদেরকে উপন্যাসের  চরিত্রের ফাবি আইয়ে আলা-ই রব্বিকুমা তুকাজ্জিবান পাঠরত মূর্খ ও সরল চরিত্রে দেখতে লাগলাম।

আমি ঠিক কোন বয়সে আধুনিক কবিতা প্রথম পড়ি? স্পষ্ট মনে নেই। জীবনান্দকেই প্রথম পড়ি। শব্দের ভেতর দিয়ে ভাবকে অনুসন্ধানের যোগ্যতা তৈরি না হলেও এক আশ্চর্য শীতার্ত সন্ধ্যাকালীন অনুভূতি আমাকে জাপটে ধরলো। কোনো এক দুপুরে আমিই  অনুকরণমূলক একটা ভাঙাচোরা কবিতা লিখে উঠলাম। সেই সাথে পড়ছিলাম একই সাথে ওপার বাংলার ‘জনপ্রিয়’ লেখকদের বই। সাহিত্যতত্ত্বের প্রবন্ধ পড়বার চেষ্টা আর শুক্রবারে দশ টাকা দিয়ে সমকাল খরিদ করে তার সাহিত্য-সাময়িকী কালের খেয়া-তে বিষয় আকারে মুক্তগদ্য। আমার জীবনে এই সময়টা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

আমার চিন্তাগত অবস্থান ধীরে ধীরে তৈরি হতে লাগলো। ফিকশন, নন-ফিকশনে ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় সমাজের প্রতি তোলা প্রশ্ন, শ্লেষ, মিলনের নূরজাহানে গড়ে তোলা ইমাম সাহেবের নেতিচরিত্র আর হাহাকার আকারে নারীবাদকথন আমাকে প্রভাবিত করতে লাগলো। এই সময়টাতে আমি অনেক কিছুরই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলাম। বিশ্বাসগত প্রশ্নকে উহ্য রেখেই আমি নামাজ ছেড়ে দিলাম। অনলাইনে চটুল ব্লগারদের নেতিবিশ্বাসগত লেখাজোকা পড়তে শুরু করলাম। ইতস্তত নজরিয়াতেই পড়তাম। বয়সন্ধির ওই জটিল সময়ে আমার জীবনে আরো একটা বড় ট্রাজেডি ঘটলো—আমি প্রথম প্রেমে পড়লাম…

(চলবে…)

আগের কিস্তি ঃ ইতস্তত কৈশোরের আলাপ 

লেখক : গদ্যকার