তাবলীগ : যে কৌশলে এগুতে চাচ্ছে সাদ অনুসারীরা

বিশেষ প্রতিবেদকঃ

দিল্লীর নেজামুদ্দিন থেকে পাঠানো মাওলানা সাদ অনুসারী এবং ঐক্যবদ্ধ আলেমদের সিদ্ধান্তের সাথে বিচ্ছিন্নতা পোষণকারী কয়েকজন আলেমের একটি জামাত এখন ঢাকায়। দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া ও অবস্থানের সঙ্গে ভিন্নমত ব্যক্ত করে যাচ্ছেন তারা। সর্বজনমান্য আলেমদের বিরুদ্ধে গিয়ে দেওবন্দের অবস্থানের ভুল ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন। নেজামুদ্দিনের মাওলানা সাদকে বিশ্ব তাবলীগ জামাতের আমীর মেনে তাবলীগের কাজ করতে হবে, এটাই তাদের মূল কথা। এ জামাতের যিনি আমীর তার নাম মাওলানা আসাদুল্লাহ সুলতানপুরি। জামাতটিকে বাংলাদেশে পথ দেখাচ্ছে ও কাজে লাগাচ্ছে কাকরাইলের সাদ অনুসারী ওয়াসিফুল ইসলাম এবং তার সাথীরা। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জায়গায় তাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আর এটা করা হচ্ছে এদেশের সাধারণ তাবলীগীদের মাঝে, যারা মাওলানা সাদের বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের ব্যাপারে দেওবন্দের অবস্থান অনুসরণ করেন, তাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও বিরোধ তৈরি করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই মরিয়া চেষ্টার সুফল তারা তুলতে পারছেন না। বরং দিন দিন সাধারণ শিক্ষিত তাবলীগী ভাইদের বড় অংশটিই দেওবন্দ এবং ওলামায়ে কেরামের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের সঙ্গে নিজেদের জড়িত করে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করছেন। তাবলীগ জামাতের ভেতরের একটি সূত্র উপরের কথাগুলো জানায়।

সূত্রটি নিশ্চিত করেছে যে, গত ৫ ও ৬ জুলাই এ এদেশে ওয়াসিফপন্থীদের একচেটিয়া মারকাজ বলে খ্যাত মিরপুর ৬ নাম্বারের মারকাজে মাওলানা আসাদুল্লাহ সুলতানপুরিকে দিয়ে বক্তব্য দেওয়ানো হয়। সেখানে তিনি মাওলানা সাদের অবস্থান ও বক্তব্যের কথিত সঠিকতা তুলে ধরেন। তাকে আমীর হিসেবে অনুসরণ করার ওপর জোর দেন।

পালা করে ফয়সল নির্ধারণের নতুন নিয়ম অনুযায়ী বর্তমান সপ্তাহে কাকরাইলের শুরার ফয়সাল বা সিদ্ধান্তদাতা হচ্ছেন মাওলানা সাদের অনুসারী একজন শুরাসদস্য। এ কারণে মাওলানা আসাদুল্লাহ ও তার জামাতকে কাকরাইল মারকাজে নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে অন্য দিকে রোখ দেবার কথা রয়েছে। মাওলানা আসাদুল্লাহ সুলতানপুরি এক সময় সহকারী হিসেবে দারুল উলুম দেওবন্দের ফতোয়া বিভাগে কাজ করতেন। তার ভুলত্রুটি ও বিচ্যুতির কারণে তাকে সেখান থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বর্তমানে দেওবন্দের সিদ্ধান্ত এবং প্রায় সব পর্যায়ের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে তাকে কাজে লাগানো হচ্ছে।

কাকরাইল মারকাজ ঘনিষ্ঠ ওই সূত্রটি আরো জানায়, সম্প্রতি মাওলানা সাদের আহবানেে নেযামুদ্দিনে বাংলাদেশীদের জোড় অনুষ্ঠিত হওয়ার পর সাদের এতায়াত বা আনুগত্যের ক্ষেত্র বাংলাদেশে সম্প্রসারিত করার বিশেষ উদ্দেশ্যে কিছু বিচ্ছিন্নতাপন্থি আলেমের জামাত পাঠানোর ধারায় মাওলানা আসাদুল্লাহ সুলতানপুরির এ জামাতটি দ্বিতীয়।এর আগে মাযাহিরুল উলুম সাহারানপুরের শিক্ষক মাওলানা আবদুল আজিমের নেতৃত্বে একটি জামাত এদেশে এসেছিল। এদেশের বিভিন্ন স্তরের আলেমদের সঙ্গে মাওলানা সাদের বিভ্রান্তির পক্ষে সাফাই পেশ করার চেষ্টা করে তারা ব্যর্থ হন। অনেকেই সাক্ষাতের অনুমতিই দেননি। অনেকের পাল্টা প্রশ্ন ও নীতিগত ব্যখ্যার সামনে তারা জব্দ হন। এরপর আসে মাওলানা আসাদুল্লাহর এই জামাত। বিশেষ মহলে মাওলানা সাদের এতায়াত বিস্তারের উদ্দেশ্য পুরো করার কাজে সফল হতে পারছেন না। আগে থেকেই মাওলানা সাদের অনুগত সাধারণ শিক্ষিত সাথীদের শান্তনা দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু ভূমিকা রাখছেন বলে বিশেষ সূত্র জানায়।

সূত্রটির মূল্যায়ন হচ্ছে, হিন্দুস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতাপন্থি কিছু আলেম এদেশে পাঠানোর উদ্দেশ্য এটা দেখানো যে, নেজামুদ্দিনের কথিত আমীর মাওলানা সাদের অনুসারীদের মধ্যে বহু আলেম ওলামা রয়েছেন। আরেকটি উদ্দেশ্য, এদেশের আলেমদের বড় একটি অংশের মাঝে প্রভাব বিস্তার করা। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তার কোনোটাই হচ্ছে না। দুনিয়াব্যাপি সহজ যোগাযোগের এই সময়ে ঐক্যবদ্ধ আলেেমদের অবস্থানকে কিছুতেই আড়াল করা যাচ্ছে না।

এদিকে নেজামুদ্দিন থেকে আসা মাওলানা আসাদুল্লাহ সুলতানপুরির জামাত সফলতার মুখ না দেখলেও তারই আপন বড় ভাই আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাওলানা উবায়দুল্লাহ সুলতানপুরির নেতৃত্ব একটি জামাত বাংলাদেশে দেওবন্দের সিদ্ধান্ত ও ঐক্যবদ্ধ আলেমদের অবস্থানের পক্ষে জোরালো দাওয়াতী কাজ করে যাচ্ছে। তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের ফারেগ এবং তাবলীগ জামাতের পুরনো মুরব্বি। তিনি নেযামুদ্দিন মারকাজে মাওলানা সাদের অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সব বিষয়ে অবগত। আলমী শুরা বা বিশ্ব তাবলীগ জামাতের শুরাভিত্তিক পরিচালনার পক্ষে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করে যাচ্ছেন তিনি । এ মুহূর্তে কুমিল্লার কাছাকাছি একটি জেলায় তার জামাত কাজ করে যাচ্ছে। মাওলানা ওবায়দুল্লাহ সুলতানপুরির বয়ানে মৌলিক দাওয়াতী কাজ যেমন গতিশীল হয়ে উঠছে, তেমনি নেযামুদ্দিনের মাওলানা সাদের প্রতি সাধারণ শিক্ষিত পুরনো তাবলীগী ভাইদের মোহও কেটে যাচ্ছে বলে সূত্রটি জানায়। ইসলামের মৌলিক বিষয়ে মাওলানা সাদের বিভ্রান্তিপূর্ণ বক্তব্য ও অবস্থান সম্পর্কে বহু সরল তাবলীগী সাথী সচেতন হতে পেরেছে।

তাবলীগ জামাতের একজন মুরব্বি জানান, আলমী শুরার চেষ্টা হচ্ছে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ সহিহ মানহাজ অনুযায়ী চালিয়ে যাওয়া। হকপন্থি আলেমদের নির্দেশনা ও পরামর্শ মেনে কাজ এগিয়ে নেওয়া। নেযামুদ্দিনের মাওলানা সাদ ওলামায়ে কেরামের সম্মিলিত সিদ্ধান্তকে বারবার উপেক্ষা করে নিজের অপব্যখ্যা ও বিভ্রান্তির ওপর অনড় থাকছেন। আকাবিরের উসুল ও মানহাজ নষ্ট করছেন। আবার এর ওপর তাবলীগী সাথীদের আনুগত্যের বাইয়াত নিয়ে তাবলীগ জামাতকে নতুন একটি ফেরকায় দাঁড় করাতে চাচ্ছেন। এই বিপর্যয়কর অবস্থা থেকে মুবারক এ জামাতকে রক্ষা করে আগে বাড়তে হলে ওলামায়ে কেরামের পুরোপুরি নেগরানি ও সংশোধনী মেনে চলার বিকল্প নেই।