
আশরাফ উদ্দীন খান
একটি শিক্ষা ব্যবস্থার কাজ ও দায়িত্ব কতটুকু এটা আমাদের সামনে স্পষ্ট থাকা জরুরী, কারণ এর মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের মূল্যায়ন করে আমরা শিক্ষা ব্যবস্থার সার্থকতা ও সফলতা নির্ধারণ করে দেখতে পারি। শিক্ষা ব্যবস্থা একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান, একটি সভ্য সমাজের সকল পরিবার তাদের সদস্যদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে থাকে, তাদের শিক্ষাগত, মানসিক ও মানবিক গুণাবলী অর্জন ও পরিপূর্ণ করার উদ্দেশ্যে, আর শিক্ষা ব্যবস্থা টিকে থাকে সমাজের জরুরত পূরণ করার উদ্দেশ্যে। এই ভিত্তিতে আমরা শিক্ষা ব্যবস্থার দায়িত্ব হিসাবে দুটি দিক দেখতে পাই—
এক. ব্যক্তিগত দিক, যেখানে ব্যক্তির উন্নতি ও উন্মেষ ঘটানো উদ্দেশ্য থাকে।
দুই. সামাজিক দিক, যেখানে সমাজের উন্নতি, উন্মেষ ও জরুরত পূরণ করার উদ্দেশ্য থাকে।
মানুষ হিসাবে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে আমাদের প্রত্যেকের বিভিন্ন যোগ্যতা, উন্নতি ও কর্মের জরুরত রয়েছে। মুসলমান হিসাবে চলতে যেমন আমাদেরকে ধর্মীয় জ্ঞান ও অনুশাসনের অনুসরণ জরুরী, ঠিক তেমনি সমাজে সকলের সাথে মিলেমিশে থাকার জন্যে দরকার সামাজিক শিষ্ঠাচার ও রীতিনীতির অনুসরণ, তদ্রুপ জীবিকা অর্জনের জন্যে দরকার বিশেষ কোন কর্ম অবলম্বন করা আর কর্মের জন্যে দরকার বিশেষ যোগ্যতা ও জ্ঞানের। মানুষের মনুষ্যত্ব, নীতি-নৈতিকতার গুণ যেমন জরুরী, ঠিক তেমনি তাদের কর্মযোগ্যতাও জরুরী বিষয়। এই সকল জরুরী বিষয়ের দীক্ষা ও প্রশিক্ষণ আমরা শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লাভ করে থাকি।
আমাদের সমাজে প্রচলিত একাধিক শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য শিক্ষা ব্যবস্থার নাম হচ্ছে ‘কওমী শিক্ষা ব্যবস্থা’। কওমী শিক্ষা ব্যবস্থা একটি ‘পরিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা’, কারণ এই শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে একজন শির্ক্ষার্থী তার জীবনের সাধারণ শিক্ষাকালের প্রায় পূর্ণ মেয়াদ অতিবাহিত করে থাকে। একজন মানুষ জীবনের শুরু থেকে নিয়ে প্রায় আড়াই যুগের মত দীর্ঘ সময় শিক্ষা অর্জনে ব্যয় করে এরপর কর্ম জীবনে প্রবেশ করে থাকে। যে ছাত্রটি কওমী মাদ্রাসায় আগমন করে, দেখা যায় তার জীবনের পূর্ণ শিক্ষাকাল ব্যয় করে সে কর্ম জীবন শুরু করছে। যেহেতু এই শিক্ষা ব্যবস্থায় একজন শিক্ষার্থী প্রবেশ করছে পরিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা বিবেচনা করেই, তাই এই শিক্ষা ব্যবস্থাকে শিক্ষার্থীদের জীবনের সকল জরুরত ও প্রয়োজনের দিকে খেয়াল রেখেই শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনা করা জরুরী ও স্বাভাবিক দাবী।
প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু মৌলিক উদ্দেশ্য থাকে, সেই হিসাবে কওমী মাদ্রাসার মৌলিক উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্বীনী ইলমের প্রচার-প্রসারের মাধ্যমে উম্মাহর মাঝে ইসলামের সঠিক ধ্যান-ধারণা প্রতিষ্ঠিত করা। দ্বীনী ইলমের একটি নির্ধারিত পরিমাণ অর্জন করা সকল মুসলমানের উপর ফরজ, আবার উম্মতের মধ্যে ধর্মীয় বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তৈরি করাও ফরজে-কিফায়াহ। আলেমে দ্বীনের মর্যাদা, তাদের দায়িত্ব ও মাদ্রাসা শিক্ষা সমাপ্ত করার পরে তারা যে তাদের দায়িত্ব ইখলাসের সাথে পালন করছেন—এগুলো নিয়ে কওমী মাদ্রাসা অবশ্যই গর্ববোধ করতে পারে। এখানে সেই বিষয়ে আলোচনা করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়, বরং আমাদের উদ্দেশ্য আরেকটি বিষয়। যেহেতু কওমী শিক্ষা ব্যবস্থা একটি পরিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থা, সেই হিসাবে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে আমাদের চিন্তাধারা বা ব্যাখ্যা কি? বা কওমী শিক্ষা ব্যবস্থায় কর্মসংস্থানের ধারণার অবস্থান কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।
এটা বিভিন্ন সময় কওমী মাদ্রাসার অভিভাবকদের পক্ষ থেকে দাবী করা হয়ে থাকে যে, কওমী মাদ্রাসা থেকে লেখাপড়া শেষ করে কেউ বেকার থাকে না, বরং তারা কোন না কোন কাজে নিয়োজিত হয়ে যায় এবং এর মাধ্যমে একদিকে যেমন দ্বীনের কাজ হতে থাকে অন্যদিকে তাদের দুনিয়ার জরুরত পূরণ হতে থাকে। একটি বিষয় সামনে আসতে পারে যে, দেখা যায়, বিভিন্ন কওমী মাদ্রাসার পরিচিতিপত্রে তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হলেও, কোথাও ছাত্রদের কর্মসংস্থানের বিষয়ে কোন ধারণা বা আলোচনার উল্লেখ নেই। বরং মনে হয়ে থাকে যে এই বিষয়ে চিন্তা করা বা কোন কিছু জানতে চাওয়া অনুচিত। কিন্তু বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের আলোকে মনে হয়েছে এই বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা সামনে রাখা একটি জরুরী বিষয়। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের ব্যাপারে আলোচনা করতে গেলে কিছু নীতিগত বিষয় সামনে এসে যায়, তাই প্রথমে সেই সকল বিষয়ে আলোচনা করা জরুরী মনে হয়।
রিজিকের ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালার ওয়াদা
ইসলামী আকিদা অনুযায়ী প্রতিটি মুসলমানের বিশ্বাস এই যে, রিজিকের একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ তায়ালা। তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে যেভাবে যতটুকু রিজিক দান করতে চান, সেই বান্দা ঠিক ততটুকুই তার জীবনে অর্জন করতে পারবে, এর থেকে বেশীও নয় আবার কমও নয়। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনের আয়াতে এরশাদ করেছেন—
এক. ‘তারা কি আপনার প্রতিপালকের রহমত বণ্টন করছে? আমি তাদের মাঝে তাদের জীবিকা বণ্টন করে দিয়েছি এই দুনিয়ার জীবনে, তাদের কতককে কতকের উপর আমি বিভিন্ন মাত্রায় প্রাধান্য দিয়েছি, যাতে তাদের কেউ অন্য কাউকে ব্যবহার করতে পারে, আর আপনার প্রতিপালকের রহমত অধিক উত্তম যা তারা সঞ্চয় করছে তা থেকে’। [সুরা যুখরাফঃ ৩২]
দুই. ‘এই জমিনে এমন কোন প্রাণী নেই যার রিজিক আল্লাহর হাতে নয়, তিনি জানেন তাদের অস্থায়ী ও স্থায়ী ঠিকানা, সবকিছু আছে স্পষ্ট কিতাবে’। [সুরা হুদঃ ৬]
এটা আমাদের সকল মুসলমানের ঈমান ও আকিদার অংশ হলেও এর হাকিকত অনুধাবন ও বাস্তবায়নের ব্যাপারে আমাদের মধ্যে বিশাল পার্থক্য দেখা যায়। কারো মতে যেহেতু আল্লাহ তায়ালা রিজিকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন কাজেই রিজিক নিয়ে চিন্তা না করে তাঁর ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকাই যথেষ্ঠ, কারণ রিজিক তিনিই তাঁর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বান্দাকে দান করবেন। আরেকটি ধারণা এই যে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার সকল কাজের জন্যে কিছু আসবাব নির্ধারণ করেছেন, তিনি বান্দাদের রিজিকের ব্যবস্থা করেছেন তবে সেই জন্যে তিনি বান্দাদের পক্ষ থেকে কর্ম ও আমলের শর্ত দিয়েছেন। এটা দুনিয়ার কোন বিষয়ে ও কাজে আল্লাহর নির্ধারিত সুন্নত, কাজেই রিজিকের জন্যে বান্দাকে অবশ্যই ফিকির ও মেহনত করতে হবে।
সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) এর আমলের দিকে যদি খেয়াল করা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে, তারা দ্বীনের কাজে যেমন অগ্রবর্তী ছিলেন ঠিক তেমনি দুনিয়ার কাজও তারা করেছেন। তারা যেমন কৃষিকাজ করেছেন ঠিক তেমনি ব্যবসা করেছেন, সফর করেছেন, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিভিন্ন কাজ ও দায়িত্বও তারা পালন করেছেন। এমনকি হযরত উমর (রাঃ) এর ইলম হাসিলের ব্যাপারে একটি প্রসিদ্ধ ঘটনা আছে যে তিনি তাঁর আনসারি সাথীর সাথে এইভাবে পালা বণ্টন করে নিয়েছিলেন যে একদিন তিনি আল্লাহর রাসুলের দরবারে উপস্থিত হতেন আর তাঁর সাথী ব্যবসা বা দুনিয়ার কাজ করতেন, আর আরেক দিন সেই সাথী আল্লাহর রাসুলের দরবারে উপস্থিত হতেন আর হযরত উমর ফারুক (রাঃ) দুনিয়ার কাজে যেতেন।
অন্যদিকে জীবিকা অর্জনের ব্যাপারে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনেক হাদীসে তাকিদ ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, সামনের হাদীসের দিকে খেয়াল করি—
এক. ‘নিজ হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম কোন জীবিকা নেই, আল্লাহর নবী দাউদ আলাইহিস সালাম নিজ হাতের কর্মের মাধ্যমে জীবিকা উপার্জন করতেন’। (বুখারী শরিফ)
দুই. ‘আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাশ দিয়ে এক ব্যক্তি অতিক্রম করে গেল, উপস্থিত সাহাবিগণ সেই ব্যক্তির শক্তি ও উদ্যমতা দেখে মন্তব্য করলেন, যদি এই ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় বের হতেন! আল্লাহর রাসুল তখন বললেন— যদি সে তার ছোট বাচ্চাদের ভরণ-পোষণের উদ্দেশ্যে বের হয়ে থাকে তাহলে সে আল্লাহর রাস্তায় বের হয়েছে, আর যদি সে তার বৃদ্ধ পিতা-মাতার ভরন-পোষণের উদ্দেশ্যে বের হয়ে থাকে তাহলেও সে আল্লাহর রাস্তায়, আর যদি সে নিজের জন্যে, নিজেকে পূত রাখার উদ্দেশ্যে বের হয়ে থাকে তাহলেও সে আল্লাহর রাস্তায়, আর যদি সে লোক দেখানো বা অহংকারের উদ্দেশ্যে বের হয়ে থাকে তাহলে সে শয়তানের পথে বের হয়েছে।’ [তাবরানি]
আবার কুরআনের এমন কিছু আয়াত রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে রিজিকের জন্যে পরিশ্রম ও কর্ম করতে, সামনের কয়েকটি আয়াতের দিকে খেয়াল করি—
এক. ‘যখন নামাজ হয়ে যায় তখন জমিনে ছড়িয়ে যাও, এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো, আর আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্বরণ করো, নিশ্চয় তোমরা সফলকাম হবে।’ [সুরা জুময়াঃ ১০]
দুই. ‘তিনি তোমাদের জন্যে জমিনকে করেছেন অবনত, তাই জমিনের কাঁধে বিচরণ করো এবং তাঁর রিজিক ভোগ করো, আর তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন।’ [সুরা মুলকঃ ১৫]
তিন. ‘তিনি জানেন যে তোমাদের মধ্যে কিছু মানুষ অসুস্থ হবে, আর কিছু কিছু মানুষ জমিনে বিচরণ করবে আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধানে, আর কিছু মানুষ আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে বের হবে, সুতরাং কুরআনের যতটুকু সহজ হয় পাঠ করো ……।’ [সুরা মুযযাম্মিলঃ ২০]
এই সমস্ত আয়াত থেকে বুঝা যায় যে, রিজিকের জন্যে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত পদ্ধতি অবলম্বন করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। উপরের আয়াতে বলা হয়েছে যে জুময়ার নামাজ আদায় হয়ে গেলে জমিনে ছড়িয়ে যাও এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করতে থাক। দ্বিতীয় আয়াতে বলা হয়েছে যে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে জমিনকে মানুষের চলাচলের জন্যে উপযুক্ত করে দেওয়া হয়েছে, এবং সেই সাথে মানুষকে জমিনের নির্ধারিত স্থানে (কাঁধে) বিচরণ করে রিজিক অন্বেষণ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। তৃতীয় আয়াতে এক সাথে তিন শ্রেণীর উল্লেখ করা হয়েছে তারা হচ্ছেন—অসুস্থ ব্যক্তি, বণিক ও আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদ; অর্থাৎ এই তিন শ্রেণীর জন্যে একই ধরণের সহজতা প্রদান করা হয়েছে।
এই সমস্ত আয়াত ও হাদীস থেকে যেটা আমাদের বুঝে আসে সেটা এই যে, রিজিকের জন্যে চেষ্টা-মেহনত করার ফজিলত রয়েছে, বরং কোন কোন ক্ষেত্রে এই ব্যাপারে জোর তাগিদ পর্যন্ত রয়েছে, হালাল রিজিক অন্বেষণ করা এক ধরণের ইবাদতও। সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) এর আমল থেকে দেখা যায় যে, তারা দ্বীনের কাজের সাথে সাথে দুনিয়ার সাধারণ জরুরত পূরণ করার জন্যে বিভিন্ন ধরণের কাজে লিপ্ত থেকেছেন।
এর বাইরে পবিত্র কুরআনে এমন কিছু আয়াত রয়েছে যার মাধ্যমে এটা বোঝা যায় যে, দ্বীনের ইলমের মাধ্যমে দুনিয়া উপার্জন করা একটি বিরাট গুনাহের কাজ, বরং তাদের দায়িত্ব হচ্ছে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে দ্বীনের খেদমত করা, এই ক্ষেত্রে মানুষের কাছে কোন কিছুর কামনা না করা এবং মানুষকে ভয় না করা। কিছু আয়াতের দিকে খেয়াল করা যাক—
এক. ‘হে আমার সম্প্রদায়, আমি তোমাদের নিকট এর কোন প্রতিদান চাই না, আমার প্রতিদান শুধুমাত্র সেই সত্তার দায়িত্বে যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তোমরা কি অনুধাবন করবে না?’ [সুরা হুদঃ ৫১]
দুই. ‘আপনি আপনার পরিবারকে নামাজের আদেশ দিন এবং নিজেও অবিচল থাকুন, আমি আপনার কাছে রিজিক চাই না, বরং রিজিক আমি আপনাকে দেব, আর শুভ পরিণাম মুত্তাকিদের জন্যে।’ [সুরা তাহাঃ ১৩২]
তিন. ‘আর ঈমান আনো যা আমি অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের কিতাবের সত্যায়নকারী, তোমরা এর প্রথম অস্বীকারকারী হয়ো না, আর আমার আয়াত দ্বারা সামান্য মূল্য গ্রহণ করো না, আমাকেই ভয় করো।’ [সুরা বাকারাহঃ ৪১]
চার. ‘আপনি তাদেরকে সেই ব্যক্তির ঘটনা বর্ণনা করুন, যাকে আমি আমার আয়াত দান করেছিলাম, কিন্তু সে সেখান থেকে বিচ্যুত হয়ে গেল, ফলে শয়তান তাকে অনুগত বানিয়ে নিল, এবং সে হয়ে গেল পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত।’ [আ’রাফঃ ১৭৫]
এখানে এই বিষয়টি স্পষ্ট থাকা উচিত যে, দ্বীনি ইলমের মাধ্যমে দুনিয়া অর্জন করা, বা দুনিয়ার কোন লাভের উদ্দেশ্যে দ্বীনী ইলম অর্জন করা একটি গর্হিত কাজ। কিন্তু দ্বীনি ইলমে মশগুল থাকার কারণে যদি কেউ দুনিয়ার কোন কাজ করতে না পারে তাহলে নিজের জরুরত পূরণ করার সুযোগ মানুষ সেই কাজ থেকে গ্রহণ করতে পারে। এই ভিত্তিতেই ইমামত, দ্বীনী ইলমের শিক্ষা প্রদান করা ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে মানুষ সম্মানী গ্রহণ করতে পারেন। এখানে আমরা আলোচনা করছিলাম কওমী মাদ্রাসার দৃষ্টিতে ছাত্রদের কর্মসংস্থান নিয়ে।
সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) দ্বীনের জন্যে জিহাদ করেছেন, দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে সফর করেছেন সেই সাথে তাদের রিজিকের একটি বাহ্যিক অবলম্বন ছিল, তাদের কেউ ব্যবসা করেছেন আবার কেউ কৃষিকাজ করেছেন। শুধুমাত্র সামান্য কিছু সংখ্যক গরিব সাহাবি ছিলেন যাদের তেমন কোন অবলম্বন না থাকার কারণে রাসুলের মেহমান হিসাবে তারা ‘সুফফা’তে অবস্থান করতেন, যাদেকে ‘আহলে সুফফা’ বলা হত; যাদের খেয়াল অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম রাখতেন। এই হিসাবে আমাদের কওমী মাদ্রাসা থেকে শিক্ষার্থীরা দ্বীনের ইলম হাসিল করছেন, এরপর কেউ দ্বীনের ইলমের প্রচার-প্রসারে নিজের জীবন উৎসর্গ করছেন, আবার কেউ দ্বীনের কাজের সাথে লিপ্ত থেকে দুনিয়ার বিভিন্ন কাজে মনোনিবেশ করতে চাচ্ছেন। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থা একপ্রান্তিক হওয়ার কারণে সেই বিষয়টি সহজ হয়ে ওঠেনি। যার ফলে শিক্ষা সমাপ্ত করার পরে বা শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি অন্য কোন প্রতিষ্ঠান বা মাধ্যমে জীবনের এই জরুরত পূরণ করার ফিকির করতে হচ্ছে। যেহেতু কওমী মাদ্রাসা একটি পরিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান, তাই এই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এমন কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করার উচিত যাতে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও স্পষ্ট হতে পারে।
রিজিকের প্রতিশ্রুতি আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। মানুষ শিক্ষিত হলেও তার রিজিকের নিশ্চয়তা দেওয়ার কোন উপায় নেই। দেখা যায় এমন অনেক শিক্ষিত মানুষ আছেন যাদের রিজিকের মধ্যে তেমন কোন প্রশস্ততা নেই, আবার এমন কোন অশিক্ষিত মানুষ আছেন যাদের রিজিকের অবস্থা অনেক ভাল ও ঈর্ষণীয়। বর্তমান যুগের বিভিন্ন বিষয় জটিল হওয়ার কারণে, এখন রিজিকের জন্যে কোন কর্ম অবলম্বন করতে হলেও সেই জন্যে তাকে বিশেষ যোগ্যতা ও শিক্ষা-প্রশিক্ষণের প্রয়োজন দেখা যায়। এই জরুরত যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা অর্জন করতে না পারে তাহলে তাদের জন্যে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পরতে হয়।
মানব সম্পদ এই দুনিয়ার সবচেয়ে দামি সম্পদ। এই সম্পদ থেকে সবচেয়ে বেশী উপকৃত হওয়ার জন্যে দরকার বিচক্ষন ব্যবস্থাপনা। মানব সম্পদের সঠিক ও উপকারী ব্যবহারের জন্যে দরকার—
এক. মানব সম্পদের সঠিক ও সূক্ষ্ম পরিসংখ্যান, অর্থাৎ প্রতিটি ব্যক্তির নির্ধারিত ও স্বতন্ত্র যোগ্যতা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা।
দুই. মানব সম্পদের উন্নয়ন সাধন, উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের যোগ্যতার উন্নয়ন ঘটানো।
তিন.মানব সম্পদকে সঠিক ক্ষেত্রে সুষ্ঠু ব্যবহার করা।
আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান তার সন্তানদের উদ্দেশ্যে বলেন,—’বৎস, ইলম অর্জন করো, যদি প্রাচুর্যের মধ্যে থাক তাহলে এটা হবে তোমার জন্যে সৌন্দর্য, আর যদি দারিদ্র্যের মধ্যে থাক তাহলে এটা হবে তোমার জন্যে সম্পদ।’
ইসলামী বা কওমী শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে আমাদের সমাজে রয়েছে আরেকটি সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থা। এই বিষয়টি নিয়ে সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যেও মতভেদ রয়েছে। এখানেও একটি প্রশ্ন রয়েছে যে, ‘শিক্ষা কি শুধুই শিক্ষার জন্য, না শিক্ষা জীবন ও জীবিকার জন্য?’ এই প্রশ্নের দাপট ছিল ঠিক সেই সময়ে যখন শিক্ষা বাস্তব জীবন ও সাধারণ মানুষের জীবনের বাইরে ছিল। প্রাচীন যুগে শিক্ষা যখন শুধুমাত্র অভিজাত শ্রেণীর ‘অধিকার’ বা ‘বৈশিষ্ট্য’ হিসাবে বিবেচিত হত তখনকার সময়ে এই প্রশ্ন করা হত। কিন্তু যুগের বাস্তবতার কারণে এই প্রশ্নের যৌক্তিকতা হ্রাস পেয়েছে। সেই দার্শনিক প্রশ্নের আলোচনা বাদ দিয়ে এখন শিক্ষা অর্থনীতি নিয়ে রীতিমত গবেষণা ও যুক্তি প্রমাণ পেশ করা হচ্ছে। সামনে আমরা শিক্ষা অর্থনীতি নিয়ে সামান্য আলোচনা করছি, যদিও শিক্ষা অর্থনীতির ধারণা আমরা কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার উপর প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকতে চাই।
সাধারণ শিক্ষা ও শিক্ষা অর্থনীতি
অতীতে শিক্ষাকে একটি মৌলিক প্রয়োজন হিসাবেই বিবেচনা করা হত, যার থেকে কোন ধরণের অর্থনৈতিক উপকারিতা অর্জনের ধারণা বা চিন্তা করা হত না। শিক্ষা ও অর্থনীতির মধ্যকার সম্পর্ক ছিল এই যে—অর্থনীতি হচ্ছে শিক্ষার অভিভাবক, যা শিক্ষার পিছনে অর্থ ব্যয় করে ও অর্থায়নের ব্যবস্থা করে থাকে, আর শিক্ষার অবস্থা ছিল আদুরে শিশুর মত যা অভিভাবকের অর্থ ভোগ করে থাকে, কিন্তু বিনিময়ে কোন কিছু দান করে না; কৃষি বা শিল্প ক্ষেত্রে যার কোন অবদান নেই, বরং শিক্ষার মাধ্যমে শুধুমাত্র কিছু দার্শনিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ তৈরি করা হয়ে থাকে। সেই সময় শিক্ষার অবস্থা ছিল এমন যে, এর মাধ্যমে অবসর সময় অতিবাহিত করা হত বা কর্ম থেকে দূরে থাকার মানসিকতা পোষণ করা হত, এবং অবস্থার দাবী ছিল এমনই যে, কৃষিকাজ বা কোন শিল্প অধিক সহজ ও সরল হওয়ার কারণে সেখানে কোন শিক্ষিত মানুষের দরকার পড়ত না, বরং সেটা অতি সহজে স্বভাবজাত অনুসরণ, অনুকরণ ও প্রত্যক্ষ অবলকনের মাধ্যমেই সমাধা করা সম্ভব হত। সেই সময়ের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক চিন্তাধারার মূলভিত্তিই ছিল বস্তুগত মূলধনের উপর।
বর্তমানে সেই মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেছে। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদদের অনেকেই এই ধারণা পোষণ করা শুরু করেছেন যে, সবচেয়ে মূল্যবান পুঁজি হচ্ছে সেই সম্পদ যা মানুষের ব্যক্তিগত উন্নতি ও অগ্রগতির উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়ে থাকে, কারণ মানুষের ব্যক্তিগত উন্নতি-অগ্রগতির মাধ্যমে মানুষের উৎপাদন শক্তি বৃদ্ধি করা সম্ভব, যার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করা সম্ভব হয়ে থাকে। এখান থেকেই মানুষের মধ্যে বিনিয়োগের ধারণার সূত্রপাত হয়। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ থেকে এই পরিমাণ উপকার বা লাভ হয়ে থাকে যা শিক্ষা ক্ষেত্রে মোট ব্যয়ের চেয়েও পরিমাণে অধিক। শুধু এতটুকুই নয়, বরং শিক্ষার বাইরে অন্যান্য অর্থনৈতিক কোন প্রকল্পে যে পরিমাণ ব্যয় করা হয়ে থাকে তার চেয়েও শিক্ষা ক্ষেত্রের ব্যয় থেকে অধিক লাভ হয়ে থাকে। এই বিষয় বা ধারণাটি আরো বেশী স্পষ্ট হয়, ১৯৬১ সালে যখন ওয়াশিংটনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বিনিয়োগ সম্মেলনের ঘোষণা পত্রে এই ঘোষণা দেওয়া হয়—‘অতীতে অর্থনীতিবিদগণ শিক্ষাকে বিবেচনা করতেন এই দৃষ্টিকোণ থেকে যে শিক্ষা এক প্রকারের জরুরত, তবে এখন তারা শিক্ষাকে বিবেচনা করে থাকেন বাস্তব বিনিয়োগ হিসাবে।’ (উসুলুত তারবিয়াহ, ড. হাসসান মুহাম্মাদ হাসসান)
একটি প্রবাদ বাক্য রয়েছে, ‘কোন দানা রোপণ করলে মানুষ তা থেকে একবারই ফল পেয়ে থাকে, আর যদি কোন গাছ লাগিয়ে থাকে তাহলে (প্রায়) দশবার ফল পেয়ে থাকে, আর যদি কোন জাতিকে শিক্ষিত করে থাকে তাহলে কমপক্ষে একশ বার তার ফল পেয়ে থাকে।’
শিক্ষা অর্থনীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষা উপকরণের যথাযথ ব্যবহার করতে সক্ষম হওয়া। এখানে ‘যথাযথ’ শব্দটির মাধ্যমে এই দিকে ইঙ্গিত করা হয় যে, উপকরণের সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যবহার করা ও সবচেয়ে অল্প খরচে কাজ সমাধান করা। এর মাধ্যমে উদ্দেশ্য হয়ে থাকে সবচেয়ে উত্তম ফলাফল অর্জন করা। অথবা কেউ শিক্ষা অর্থনীতির পরিচয় দিয়েছেন এইভাবে—’এটা এমন একটি শাস্ত্র যা শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত অর্থ, জনবল, প্রযুক্তি, সময় ইত্যাদির ব্যবহারের উপযুক্ত পথ-পদ্ধতি নিয়ে আলচনা করে; যার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের বুদ্ধি, জ্ঞান, চরিত্র, রুচি, মানসিকতা, স্বাস্থ্য ও সমাজের সাথে তার বর্তমান ও ভবিষ্যতের সম্পর্ক গঠন করা ও এই সকল বিষয়কে সঠিক ও সুষম ভাবে বণ্টন করা।’
শিক্ষা অর্থনীতির গবেষণার ক্ষেত্র অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত, এখানে গবেষণার মাধ্যমে সমাজের প্রকৃত জরুরত নির্ধারণ করে সেই জরুরত কিভাবে পূরণ করা যেতে পারে সেই সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা পেশ করা হয়ে থাকে। যার মাধ্যমে শিক্ষানীতিমালা নির্ধারণের সময়ে সহযোগিতা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। শিক্ষা অর্থনীতির গবেষণার সার-সংক্ষেপ হচ্ছে নিম্নরুপ—
এক. শিক্ষা ক্ষেত্রে সনাতন ব্যয়ের উৎস থেকে ভিন্ন কোন উৎস অনুসন্ধান করা, অর্থাৎ শিক্ষাক্ষেত্রে সাধারণত সরকারের পক্ষ থেকে ব্যয় করা হয়ে থাকে, তবে বর্তমানে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই ব্যয় ভার গ্রহণ করে থাকে বা তাদেরকে অনুসন্ধান করে বের করা।
দুই. সকল শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সংখ্যা ও ধরণ নির্ধারণ করা, এবং এটা চিন্তা করে দেখা যে, এটা বাস্তবায়ন করার জন্যে কী পরিমাণ আর্থিক শক্তি ও জনবল আছে।
তিন. শিক্ষা পরিকল্পনার বাস্তবায়নের ব্যয় নির্ধারণ করা।
চার. শিক্ষা ক্ষেত্রে বিনিয়োগ লাভ নির্ধারণ করা, এখানে শিক্ষার মান ও পরিমাণ উভয়টাই বিবেচনা করে দেখা হয়।
পাঁচ. শিক্ষার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্যে শিক্ষা পদ্ধতি কতটুকু উপযুক্ত সেটা নির্ধারণ করে দেখা। এখানে শিক্ষার আভ্যন্তরীণ ও বাইরের মূল নীতিমালা প্রভাব নিয়ে চিন্তা করা হয়।
অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে যোগ্যতা হচ্ছে এমন একটি ধারণা যা সবচেয়ে কম পরিশ্রম ও ব্যয় থেকে সবচেয়ে বেশী মুনাফা অর্জন করার দিকে ইঙ্গিত করে থাকে, পক্ষান্তরে শিক্ষা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে যোগ্যতার অর্থ হচ্ছে এমন একটি ধারণা যা শিক্ষার মাধ্যমে উদ্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার শক্তি ও সামর্থ্যকে বুঝায়। তাই শিক্ষা ক্ষেত্রে যোগ্যতার ধারণা শিক্ষার উপায়-উপকরণের যথার্থ ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার উদ্দেশ্য অর্জন করার সাথে জড়িত থাকে। যোগ্যতা এখানে দুই দিক হয়ে থাকে—
১. অভ্যন্তরীণ যোগ্যতা
২. বাহ্যিক যোগ্যতা
পরিমাণের দিকে থেকে অনেক সময় দেখা যায় যে, শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে আমরা এমন অনেক সংখ্যক শিক্ষার্থী বা শিক্ষা সমাপ্তকারী পেয়ে থাকে যাদের ‘তাখাসসুস’ এমন কোন বিষয়ে যা সমাজে তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, আবার সমাজে এমন অনেক বিষয় বা তাখাসসুসের জরুরত রয়েছে যে ব্যাপারে কোন বিশেষজ্ঞ তৈরি হচ্ছে না, অন্যদিকে মানের দিক থেকে দেখা যায় যে, অনেক সময় এমন অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা গ্রহণ করে বের হচ্ছেন কিন্তু সেই বিষয়ে তাদের যে পরিমাণ যোগ্যতা থাকা দরকার ঠিক সেই পরিমাণ যোগ্যতা নিয়ে তারা বের হতে পারছেন না। এই উভয় ক্ষেত্রে শিক্ষার আভ্যন্তরীণ যোগ্যতা অনেক উচ্চ হবে, কিন্তু তার বাহ্যিক যোগ্যতা হবে অনেক দুর্বল। এই অবস্থা থেকে অনেক সামাজিক ব্যধির কারণ হয়ে থাকে, যেমন—
১. শিক্ষিত বেকার
২. পরোক্ষ বেকারত্ব
৩. অতিরিক্ত শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করার মানসিকতা বা প্রবণতা।
‘এই সকল ব্যাধির কারণে সামাজিক উন্নতি ও উন্নয়নের ধারা দূর্বল হয়ে থাকে এবং শিক্ষার মূল্য হ্রাস পেতে থাকে।’ (উসুলুত তারবিয়াহ, ড. হাসসান মুহাম্মাদ হাসসান)
এটা গেল সাধারণ শিক্ষার সাথে অর্থনীতির সম্পর্কের কথা। নীতিগতভাবেই আমরা ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা বা বিশেষ করে কওমী শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে এই ভাবে শিক্ষা অর্থনীতির ধারণা নিয়ে আলোচনা করতে পারি না। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরী যে, যে কোন বিষয়ে ব্যক্তিগত পছন্দ বা অপছন্দের কারণে আমাদের প্রত্যেকের একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা মত থাকতেই পারে, উদাহরণ হিসাবে মহিলাদের ঘরের বাইরে কাজ করার ব্যাপারটি সামনে আসতে পারে। একটি পরিবারের অভিভাবক হিসাবে এই বিষয়ে আমার একটি ব্যক্তিগত মতামত ও সিদ্ধান্ত থাকতেই পারে, কিন্তু শরিয়াতের নীতিমালা ও আদেশ-নিষেধের দিকে খেয়াল করে এই বিষয়ে উম্মতের সকল সদস্যের দিকে খেয়াল করে অবশ্যই আমাদেরকে একটি সিদ্ধান্ত পেশ করতে হবে। তেমনিভাবে কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থী বা শিক্ষক হিসাবে আমার একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত থাকতে পারে, কিন্তু সমগ্র উম্মতের দিকে খেয়াল করে এই বিষয়ে অবশ্যই আমাদের একটি সামগ্রিক সিদ্ধান্ত থাকতে হবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে কওমী মাদ্রাসার দর্শনের আলোকে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের বিষয়ে আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করা সময়ের দাবী।
