আলী আজ জাফীরি, সংগ্রামী এক সাংবাদিকের পথচলা

ইফতেখার জামিলঃ

‘সংবাদ মাধ্যম শুধু আলোচিত সংবাদ সরবরাহ করেনা, এর পাশাপাশি সঙ্কট অনুসন্ধান করে, সংবাদ তৈরি করে এবং রাজনৈতিক অবস্থান পর্যালোচিত করে। নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই। যখন এক পক্ষ আরেক পক্ষের ওপর স্পষ্টভাবে জুলুম করছে, তখন আপনি নিরপেক্ষ থাকতে পারেন না। বস্তুনিষ্ঠ থাকবেন, সেটা আপনার সাংবাদিকতার দায়, তবে পরিবর্তন প্রত্যাশী মানুষ হিসেবে আপনি কখনোই মূল্যবোধ ও অবস্থানহীন থাকতে পারেন না। একই কারণে আপনি নিরপেক্ষও থাকতে পারেন না।’  কথাগুলো মুসলিম বিশ্বে নতুন ধারার সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান পুরুষ প্রখ্যাত আরব সাংবাদ কর্মী আলী আজ জাফীরির। যিনি বিশ্বাস করেন, সংবাদপত্র ছাড়া বিপ্লবের শর্ত তৈরি হয়না। সংবাদপত্র বিপ্লব করতে পারেনা বটে। তবে বিপ্লবের প্রণোদনা ও প্রতিশ্রুতি দান করে।

প্রাথমিক সংবাদকর্ম

সৌদির নাগরিক আলী জাফীরির পড়াশোনার মূল বিষয় ছিল মনোবিজ্ঞান।পরবর্তীতে সাংবাদিকতা বিষয়ে ডিপ্লোমা করেন। কাজ শুরু করেন সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় বেতারে। তার সহকর্মীদের কাছে সংবাদকর্মের মানে ছিল পশ্চিমা সংবাদ সংস্থা থেকে সংবাদ সংগ্রহ ও রাষ্ট্রীয় মতামতের প্রচার। ফলে এর ভোক্তা শ্রোতার সংখ্যাও কম ছিল। আলী জাফীরি এতে ক্লান্ত বোধ করেন। সংবাদ সংগ্রহ ও মতামত প্রদানে কৌশলগত পরিবর্তন আনেন। বিশেষত আমেরিকার ইরাক আক্রমণের পর তিনি শক্ত ভূমিকা পালন করেন। সৌদি এক টিভি চ্যানেলে টকশো প্রোগ্রাম শুরু করেন। যাতে রাজনৈতিক মাত্রা ও প্রবণতা ছিল। ফলে অনুষ্ঠানটি দ্রুতই আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়ে উঠতে থাকে। বনে বসে বনের রাজার সাথে লড়াই করা যায়না। আলীও পারেন নি। আলীকে তার সব চাকরী থেকে ছাটাই করা হয়।       

আল জাজিরায়

আরবের প্রায় সব সংবাদকর্মীই আল জাজিরায় কাজ করার স্বপ্ন দেখেন।স্বাধীনতা, পেশাদারিত্ব,বস্তুনিষ্ঠতা ও পারিশ্রমিকের দিক দিয়ে আল জাজিরাই আরবের সবচেয়ে অগ্রসর পত্রিকা। সে হিসেবে আলী জফীরিও আল জাজিরায় কাজ করার স্বপ্ন লালন করতেন। কিছুদিন কর্মহীন থাকার পর তার সামনে আল জাজিরায় কাজ করার সুযোগ এসে যায়। তিনি তার স্মৃতিকথায় লেখেন, আমি ভেবেছিলাম, জীবনের অন্যান্য প্ররিক্রমার মতো এখানেও আমি খুব বেশীদিন টিকতে পারবোনা। তার অনুমান ভুল ছিল। এই আল জাজিরাতেই তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন।

ইতিহাসের পথ ধরে

প্রথম দিকে সংবাদ উপস্থাপক হিসেবে যোগ দিলেও আলী জাফীরি পরবর্তীতে অনুষ্ঠান পরিচালক ও উপস্থাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এবং পরবর্তী তেরো বছর আল জাজিরায় দুটি অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। এবং ইতিহাসের অংশ হয়ে যান।

প্রথম দিকে ফীল উমুক নামের অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। এখানে তিনি আরব আলেম, শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদদের  আমন্ত্রণ জানান। এবং আরব বিশ্বের সঙ্কট, সংস্কার ও পরিবর্তন নিয়ে খোলামেলা আলোচনা শুরু করেন। অনেকে মনে করেন, এই আলাপগুলো বোধহয় নিছক কিতাবি আলাপ, সংবাদপত্রের নয়। আলী জাফীরি বলেন, পরিবর্তন আলাপের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়। সংবাদপত্র সেই আলাপের পরিসর  ও আনুষ্ঠানিকতা তৈরি করে। তাত্ত্বিকতা ও ব্যাখ্যাকে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। এ অর্থে সংবাদ মাধ্যম বিপ্লবের শর্ত তৈরি করে।

আলী জাফীরি জাতীয়তাবাদী মানুষ ছিলেন, তবে তিনি মানুষের অধিকার ও মানবিক মর্যাদায় বিশ্বাস করতেন। সে হিসাবে সব শ্রেণীর মানুষকে তিনি তার অনুষ্ঠানে দাওয়াত করতেন। গত পঞ্চাশ বছর ধরে যেসব চিন্তা ও কণ্ঠ জনসাধারণের সামনে আসতে পারেনি, তিনি সেসব চিন্তা ও কণ্ঠকে গণপরিসরে নিয়ে আসেন। তার অনুষ্ঠানগুলো আরবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। তিনি যেসব বিষয় উঠিয়ে আনতেন, সেসব বিষয়ে শুরু হত আলাপ, তর্ক ও পর্যালোচনা। এভাবে একসময় আরব বসন্তের সূচনা হয়ে যায়।

বিপ্লবের ময়দানে

পশ্চিমা ও আরব সংবাদ মাধ্যমগুলো বিপ্লবের সংবাদ লুকিয়ে ফেলতে চেষ্টা করেছে। বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা বলে আখ্যায়িত করেছে। এর মধ্যে আলী ও তার সহকর্মীরা মাঠে নেমে পড়েন। খেলাধুলা ও নির্বাচনের মতো শুরু হয় বিপ্লবের সরাসরি সম্প্রচার। তিউনিনিসিয়ার সাফল্যে পুরো আরব অঞ্চলেই নতুন দিনের প্রণোদনা ও প্রতিশ্রুতি তৈরি হয়। এক এক করে প্রায় প্রতিটা দেশেই ছড়িয়ে পড়ে বিপ্লব।

এ সময় আল জাজিরার অধিকাংশ অনুষ্ঠান সম্প্রচার বন্ধ করে সারাদিন বিপ্লবের সরাসরি সম্প্রচার শুরু হয়। মিসরের ঘটনা প্ররিক্রমা সম্প্রচার করতে আলী জাফীরি খোদ নিজেই সে দেশে চলে যান। মিসরবাসীদের সাথে উদযাপন করেন  রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও পরিবর্তনের ডাক।

প্রতিবিপ্লব ও নতুন পরিকল্পনা

পরিবর্তন অর্জন করার জন্য যোগ্য ও প্রস্তুত হয়ে উঠতে হয়। আরবের অধিকাংশ অঞ্চল পরিবর্তনের জন্য যোগ্য ও প্রস্তুত ছিলোনা। ফলে অনেক দেশেই প্রতিবিপ্লব শুরু হয়। আলী জাফীরি আঞ্চলিক শক্তিগুলোর দুর্বলতা ধরতে পারেন।  সেই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বিশ্বের পরিবর্তনের সফল নায়কদের সাক্ষাৎকার ভিত্তিক অনুষ্ঠান শুরু করেন, যার নাম দেন আল মুকাবালাহ। অল্পদিনের মধ্যেই আল মুকাবালাহ ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এরদোগান, মাহাথির মোহাম্মদ থেকে শুরু করে মুসলিম বিশ্বের প্রভাবশালী নেতাদের সামান সামনি অকপট বক্তব্য ও অবস্থান দর্শকরা দেখতে শুরু করে।

তবে খুব বেশীদিন এই অনুষ্ঠান চলেনি। চার আরব রাষ্ট্র কাতারের ওপর অবরোধ আরোপ করে। সৌদি সরকার আলী জাফীরিকে দেশে ফিরতে ও আল জাজিরা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করে। কিছুদিন তাকে গৃহবন্দী করে রাখার পর কুয়েতে যাবার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে পাশাপাশি কিছু কঠোর শর্তও আরোপ করে দেওয়া হয়। যার অংশ হিসেবে আলী জাফীরি এখনো সংবাদ মাধ্যমে ফিরতে পারেন নি। কবে ফিরবেন, তাও এখনো স্পষ্ট নয়।

তবে তার আগেই আলী জাফীরি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন। 

বিজ্ঞাপন
আগের সংবাদমাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে কেন এই ফল বিপর্যয়?
পরবর্তি সংবাদবৃষ্টি তোমার নামে