
রাগিব রব্বানি :
ভোলার বুরহানুদ্দিন উপজেলায় ধর্মানুভূতিতে আঘাতের প্রতিবাদে বিক্ষোভরত জনতার ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ, চার মুসল্লির শাহাদত এবং শতাধিক আহত হবার ঘটনায় পুরা দেশেই স্থানে স্থানে প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভ চলমান। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ডাকে গতকাল দেশজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের শিকার যাঁরা হয়েছেন, তাঁদের পরিবারের খোঁজ-খবর নেওয়া কিংবা আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার ব্যাপারে তেমন কাউকে উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি। ঘটনার পরদিন বুরহানুদ্দিন থানা পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা পাঁচ হাজার মুসল্লির বিরুদ্ধে মামলা করেছে, যার ফলে বুরহানুদ্দিনের সাধারণ শ্রেণির আলেম ও ধর্মপ্রাণ জনতার অনেকেই গ্রেপ্তার-আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন, এই বিষয়টি নিয়েও কাউকে খুব একটা তদবির করতে দেখা যাচ্ছে না।
আরও পড়ুন : ভোলা হত্যাকাণ্ড : প্রত্যক্ষদর্শীরা যা বলছেন
ময়মনসিংহের আলেমদের সংগঠন ইত্তেফাকুল উলামা বৃহত্তর মোমেনশাহী’র কয়েক সদস্যের একটা প্রতিনিধিদল ছাড়া ভোলার বাইরের কোনো সংগঠন বা ওলামায়ে কেরাম এখন পর্যন্ত আহত-নিহতদের খোঁজখবর নিতেও আসেননি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এদিকে যাঁদের আহ্বান ও নেতৃত্বে রোববারের সেই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, বুরহানুদ্দিন উপজেলার শীর্ষস্থানীয় এসব আলেমও এখন অনেকটা নিস্ক্রিয় ভূমিকায় রয়েছেন। সমাবেশে দ্বিতীয় সারির নেতা বা কর্মী হিসেবে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা খুব একটা যোগাযোগ করতে পারছেন না তাঁদের সাথে। এমনকি অজ্ঞাতনামা পাঁচ হাজারের বিরুদ্ধে মামলায় তাঁরা যে আতঙ্কে ভুগছেন, সে ব্যাপারেও কোনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না স্থানীয় আলেমদের কাছ থেকে। এমনটাই জানিয়েছেন সাচড়া ইউনিয়নের এক মাদরাসা-শিক্ষক মাওলানা রিয়াজ মাহমুদ।
আরও পড়ুন : ভোলা হত্যাকাণ্ড : মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে অনেক প্রশ্ন
এদিকে ইত্তেফাকুল উলামা ময়মনসিংহের ভোলা সফররত প্রতিনিধিদলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইসলামী আন্দোলনের কিছু নেতা-কর্মী আহতদের সেবায় বেশ দৌড়ঝাঁপ করছেন। ভোলা হত্যাকাণ্ড পরবর্তী পরিস্থিতিতে দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভূমিকা প্রশংসনীয়। এর বাইরে ঢাকা কিংবা দেশের অন্য কোনো জেলার আলেম-উলামা এখন পর্যন্ত সরেজমিনে এসে কোনো খোঁজ-খবর নেননি আহত-নিহতদের ব্যাপারে।
ইত্তেফাকের প্রতিনিধিদলে থাকা আলেম আমির ইবনে আহমদ ফাতেহ টুয়েন্টি ফোরকে বলেছেন, ভোলার পরিস্থিতি বর্তমানে বেশ থমথমে। বুরহানুদ্দিন উপজেলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ তৎপর ও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এদিকে গতকাল ভোলা শহরেও সতর্ক অবস্থানে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। স্থানীয়রা একদিকে যেমন আতঙ্কগ্রস্ত, অপরদিকে রোববারের হত্যাকাণ্ডে প্রচণ্ড ক্ষোভ কাজ করছে তাদের ভেতরে। বিশেষ করে এ ঘটনায় মিডিয়ার ভূমিকাকে তারা মিথ্যাচার হিসেবে দেখছেন। সেদিন কী ঘটেছিল, কেন ঘটেছিল গণমাধ্যম এ ব্যাপারে কোনো অনুসন্ধানী রিপোর্ট না করে উল্টো সাধারণ জনতাকে দোষারোপ করার কারণে তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী ও সরকার পক্ষের বক্তব্যেরও নিন্দা জানাচ্ছেন তাঁরা।
ইত্তেফাকের প্রতিনিধিদলটি হত্যাকাণ্ডে শাহাদতবরণকারী তিনজনের পরিবারের সঙ্গে দেখা ও তিন শহিদের কবর জিয়ারত করতে পেরেছে। মাওলানা আমির ইবনে আহমদ জানান, তিন শহিদের পরিবারেই তাঁরা নিদারুণ হাহাকার দেখেছেন। তবে মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও তাঁদের সন্তানদের শাহাদাতে গর্ববোধও করছেন। একই সঙ্গে এ অন্যায় হত্যাকাণ্ডের বিচারও চান তাঁরা। কিন্তু পুলিশ-প্রশাসন এ হত্যাকাণ্ডের দায় স্থানীয় আলেমদের কাঁধে চাপাতে চায় বলে তাঁরা অভিযোগ করেছেন প্রতিনিধিদলের কাছে।
আরও পড়ুন : ফেসবুকে ভোলা হত্যাকাণ্ডের সমালোচনা : ধর্মীয় ‘উস্কানি’র অভিযোগে মাদরাসাছাত্রসহ গ্রেপ্তার ২
আমির ইবেন আহমাদ বলেন, মাহফুজুর রহমান পাটোয়ারী নামে যে যুবক শাহাদাত বরণ করেছেন, তাঁর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গেলে শহিদ মাহফুজের পিতা জানান, তাঁর ছেলের নিহত হবার ঘটনায় স্থানীয় আলেমদের আসামী করে মামলা দায়েরের ব্যাপারে প্রশাসন তাঁকে নানাভাবে প্ররোচিত করছে। তবে তিনি এ অন্যায় কাজ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন : নবীর ইজ্জত রক্ষায় লক্ষ জনতা জীবন দিতে প্রস্তুত : আল্লামা বাবুনগরী
এদিকে সাচড়া মাহমুদিয়া মাদরাসা দরুন বাজারের প্রধান শিক্ষক রিয়াজ মাহমুদ জানান, আন্দোলনের মূল ডাক যাঁরা দিয়েছিলেন, তাঁরা এখন নিস্ক্রিয়। তিনি নানাভাবে তাদের সাথে যোগাযোগ করে আহত-নিহতদের পরিবারের খোঁজ-খবর নেওয়া, কারা কারা আহত হয়েছেন, আর কারা শাহাদাত বরণ করেছেন, অন্তত একটা তালিকা তৈরি করে রাখার ব্যাপারে তাদেরকে আহ্বান জানিয়েছেন, কিন্তু কেউই ওভাবে সাড়া দিতে চাচ্ছেন না।
তিনি বলেন, আহত-নিহতদের একটা তালিকা এখন খুব জরুরি। কারণ, অল্প কিছুদিন পরে হয়তো এই হত্যাকাণ্ডকে অস্বীকার করা হতে পারে। তখন এটা দলিল হিসেবে কাজে লাগবে। একই সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার যদি কোনোকালে হয়, তখনও তা জরুরি।
আরও পড়ুন : ভোলার ঘটনায় দেশব্যাপী হেফাজতের ৫ দফা কর্মসূচি ঘোষণা
তিনি জানান, মধ্যম ও নিচের সারির নেতা-কর্মীরা এখন আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন। তাদের কেউ গ্রেপ্তার হলে কী করা বা কী ভূমিকা রাখা উচিত, সে ব্যাপারেও কেউ কিছু বলছেন না। আতঙ্কজনক এ পরিস্থিতি থেকে কীভাবে উতরে ওঠা যায়, সেই দিকনির্দেশনা আসছে না কোথাও থেকে। অনেকেই গুলিবিদ্ধ ও আহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশ আম জনতা, তাঁদের পাশে দাঁড়ানো, নিদেনপক্ষে সান্ত্বনা দিতেও ওলামায়ে কেরামের কোনো ভূমিকা নেই এখন পর্যন্ত।
