
রাগিব রব্বানি
তাবলিগের বিতর্কিত আমির মাওলানা সাদ কান্ধলভির কিছু বক্তব্যের ওপর আপত্তি জানিয়েছিল কওমি মাদরাসা শিক্ষাধারার মুরব্বি প্রতিষ্ঠান ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ। সে পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের উলামায়ে কেরাম বিশ্ব ইজতেমায় সাদ সাহেবের আগমন এবং তাবলিগে তার নেতৃত্বের বিরোধিতা করে আসছেন বছর দুয়েক ধরে। এবং গত বছরের ইজতেমায়ও তার অংশগ্রহণে বাধা দিয়েছেন।
এসবকে কেন্দ্র করে আলেমদের সঙ্গে মাওলানা সাদের অনুসারীরা বেশ কিছু অপ্রীতিকর ঘটনারও জন্ম দিয়েছেন। তারা তাবলিগ বিষয়ে আলেমদের এ সক্রিয়তাকে ‘বহিরাগতদের নাক গলানো’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছেন। সর্বশেষ গত ১ ডিসেম্বর টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে নীরিহ আলেম তালাবা ও আলেমদের অনুসারী সাধারণ তাবলিগিদের উপর নজিরবিহীন ও নৃশংস হামলা চালিয়ে তাদের চূড়ান্ত ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।
আরও পড়ুন : তাবলিগ-সঙ্কট নিয়ে কী ভাবছেন সাদপন্থীরা?
আলেমগণ তারপরও নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি। তাঁদের দাবি, সাদ সাহেব তাঁর আপত্তিকর বক্তব্যের ব্যাপারে স্পষ্ট ও প্রশ্নাতীতভাবে দেওবন্দের কাছে রুজু না করলে তাবলিগে তাঁর নেতৃত্ব কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। এবং তাঁর বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য থেকে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষকে বাঁচাতে বিশ্ব ইজতেমায়ও তাঁকে খংশগ্রহণ করতে দেওয়া হবে না।
আরও পড়ুন : তাবলিগ সঙ্কট : মতাদর্শিক বিরোধ কি চিরকালই সমাধানের অযোগ্য?
প্রশাসন এ বিবাদ নিষ্পত্তির জন্য উভয় পক্ষের সঙ্গে বেশ কয়েকবার বৈঠক করেছে। সর্বশেষ গত ১ ডিসেম্বরের হামলার পর আলেমগণ গত ৭ জানুয়ারি ঢাকার উত্তরাতে সারাদেশের আলেম ও তাবলিগি মুরব্বিদের সমন্বয়ে এক পরামর্শ সম্মেলনের আহ্বান করেছিলেন। কিন্তু প্রশাসন এ সম্মেলন স্থগিত করার অনুরোধ জানায় উলামায়ে কেরামকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ে সাদপন্থী ও উলামায়ে কেরামকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় একটি বৈঠকও করে প্রশাসন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, সাদ সাহেবের ব্যাপারে ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ যে সিদ্ধান্ত দেয় সে সিদ্ধান্ত উভয় পক্ষ মেনে নেবে এবং প্রশাসন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এ উপলক্ষে সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, সাদপন্থী ও আলেমদের কয়েকজন মুরব্বির সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিনিধিদল দেওবন্দ সফর করবে।
সফরের ডেট নির্ধারণ করা হয়েছিল গত ১৫ ডিসেম্বর। কিন্তু প্রতিনিধিদলের কয়েকজন সদস্যের ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার দরুণ ১৫ ডিসেম্বরের যাত্রা স্থগিত করা হয়েছে। তাবলিগ বিষয়ে আলেমদের মুখপাত্র মাওলানা কেফায়াতুল্লাহ আজহারি জানিয়েছেন, আগামী ১৯ বা ২০ জানুয়ারি প্রতিনিধিদল যাত্রা করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ধর্মমন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে ১৫ থেকে ২২ জানুয়ারির ভেতর যেকোনো একদিন প্রতিনিধিদল দেওবন্দ সফর করবেন।
প্রতিনিধিদল দেওবন্দ-কর্তৃপক্ষের কাছে কী জানতে চাইবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে গতকাল মাওলানা কেফায়াতুল্লাহ আজহারি ফাতেহ টোয়েন্টি ফোরকে বলেছেন, এ ব্যাপারে গত ১৪ জানুয়ারি ধর্মমন্ত্রণালয়ে মাননীয় ধর্মপ্রতিমন্ত্রী শেখ মো. আবদুল্লাহর সভাপতিত্বে এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে সাদপন্থীদের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা ফরিদউদ্দীন মাসউদ, কাকরাইলের মুরব্বি সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম ও মাওলানা আশরাফ আর আলেমদের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন যাত্রাবাড়ির শায়খ মাওলানা মাহমুদুল হাসান, কাকরাইলের মুরব্বি মাওলানা রবিউল ইসলাম এবং মাওলানা মাহফুজুল হক।
বৈঠকে সাদপন্থীরা বলেন, তাঁরা দেওবন্দ-কর্তৃপক্ষকে তিনটি প্রশ্ন করবেন। এক. মাওলানা সাদ আহলে সুন্নত ওয়াল জামাত থেকে বের হয়ে গেছেন কি-না। দুই. তিনি দেওবন্দের কাছে রুজু করেছেন কি-না। তিন. তিনি বাংলাদেশে আসতে দেওবন্দের আপত্তি আছে কি-না।
কিন্তু আলেমরা এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলেন, আমরা দেওবন্দকে কেবল দুটো জিনিশ জিজ্ঞেস করতে চাই। ১. সাদ সাহেবের পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে প্রেরিত রুজুনামা দেওবন্দ গ্রহণ করেছিল কি-না। ২. বর্তমানে সাদ সাহেবের ব্যাপারে দেওবন্দ আস্থাশীল কি-না।
তারপর অনেক আলোচনা-পর্যালোচনার পর সাদপন্থীদের প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে ধর্মপ্রতিমন্ত্রী সিদ্ধান্ত দেন যে, সাদ সাহেবের ব্যাপারে দেওবন্দ কর্তৃপক্ষ আস্থাশীল কি-না এবং তাঁর কৃত রুজুনামা দেওবন্দ গ্রহণ করেছিল কি-না—এ দুটো বিষয়ই কেবল দেওবন্দের কাছে জানতে চাওয়া হবে। এবং দেওবন্দের রায়ের ওপর ভিত্তি করেই তাবলিগ বিষয়ে একটা সুরাহা করবে ধর্মমন্ত্রণালয়।
আরও পড়ুন : তাবলিগ-সঙ্কট : দেওবন্দ সফরে যারা থাকছেন
