
ওয়ালি উল্লাহ আরমান
আঞ্চলিক রাজনীতির কুটকৌশল, কর্তৃত্ব ও বস্তুবাদী স্বার্থের খেলায় বিপন্ন হয়ে পড়েছে রোহিঙ্গা জাতি, আর চরম অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা ১৬ কোটি বাংলাদেশী।
সেই আশির দশক থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে জাতিগত গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গা মুসলিমরা নিরাপদ ঠিকানা এবং জীবন বাঁচানোর জন্য উত্তাল সাগর আর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়িপথ অতিক্রমে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশের মানুষও তাদেরকে উদারচিত্তে আশ্রয় দিয়েছে। বিশেষত গত দু’বছরে যখন একইসাথে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসতে থাকে তখন সরকারের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষ, রাজনৈতিক সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠান মানবিক সহায়তার হাত প্রসারিত করে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।
আরও পড়ুন : ‘বার্মার প্রথম এবং প্রধান সংকট হলো দেশটির বামার জনগোষ্ঠীর একাধিপত্য’: আলতাফ পারভেজ
রোহিঙ্গাদের নিকটতম প্রতিবেশী এবং অভিন্ন ধর্মাবলম্বী হিসেবে সহানুভূতির কারণে আমাদের ক্ষোভ আর অভিযোগের লক্ষ্যবস্তু মিয়ানমারের সামরিক জান্তা এবং কথিত মানবতা ও শান্তির নেত্রী অং সান সুচির উপর এবং এমনটাই হওয়ার কথা। কারণ যুগ যুগ ধরে মিয়ানমার সরকার আর সাম্প্রতিককালে তাদের মানবতার নেত্রী রোহিঙ্গাদের জাতিগত নিধন এবং নিজ দেশ থেকে অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দেয়ার ক্ষেত্রে মূখ্য ভূমিকা পালন করেছে।
মিয়ানমার সেনা ও পুলিশের হাতে রোহিঙ্গারা বর্বরোচিত, নৃশংস ও পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছে। আধুনিক সভ্যতার চরমতম উৎকর্ষতার দিনে যখন গোটা পৃথিবীতে মানবতার জয়গান গাওয়া হচ্ছে, ঠিক তখন রোহিঙ্গাদেরকে দলবেঁধে জীবন্ত দগ্ধ করা হয়েছে। নারী স্বাধীনতা ও নারীর অধিকার সংরক্ষণের এই মহেন্দ্রক্ষণে পিতা, স্বামী, ভাই এবং সন্তানের সামনে রোহিঙ্গা নারীদের পাইকারি ধর্ষণ করা হয়েছে। তাদের ঘরবাড়ি ক্ষেত-খামার পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। গৃহপালিত পশু জবরদখল অথবা হত্যা করা হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আর মানুষের মৌলিক অধিকার তথা অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা এবং ইজ্জত-আব্রু সহ নিরাপদে বাস করার অধিকার তো বহু আগেই কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন : আসামের ডিটেনশন ক্যাম্পে নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে : জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ
এভাবে একটি জাতিকে সমূলে নিধন ও তাদের শেকড়চ্যুত করে শরণার্থী বানিয়ে ভিনদেশে ঠেলে দেওয়া এবং ষোল কোটি বাংলাদেশীকে ঘোর অমানিশার দিকে নিক্ষেপের পেছনে আঞ্চলিক সম্প্রসারণবাদী দুটি রাষ্ট্র তথা চীন এবং হিন্দুস্তানের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি আস্তে আস্তে দৃশ্যমান হচ্ছে। দেশী-বিদেশী গণমাধ্যম এবং নিউজ পোর্টালে গবেষকদের লেখায় প্রসঙ্গটি মাঝে মাঝে আলোচিত হয়।
কয়েক দশক যাবত সেনা শাসনাধীন মিয়ানমারকে আর্থিক ও সামরিক সহযোগিতা এবং পৃষ্ঠপোষকতায় টিকিয়ে রাখতে অগ্রভূমিকা পালন করছে চীন ও ভারত। সম্প্রতি তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে চীনে সরবরাহের পাশাপাশি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য চীন মিয়ানমারে হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। ওই মেগা প্রজেক্টের মূল কেন্দ্রবিন্দু রাখাইন রাজ্য। ওদিকে ভারতও ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ মিয়ানমারে বহু অর্থ বিনিয়োগ করেছে।
এমনিতে বিশ্বরাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে বাহ্যিকভাবে চীন ও ভারত দুই মেরুতে অবস্থান করলেও মিয়ানমারে এসে তাদের স্বার্থ এক ও অভিন্ন জায়গায় মিশে গেছে। আর সেই বৃহৎ দুই শক্তিধরের স্বার্থের বলি হয়েছে প্রথমত ক্ষুদ্র রোহিঙ্গা জাতি। এর পাশাপাশি চীন ভারতের স্বার্থের মারপ্যাঁচে ষোলকোটি বাংলাদেশীর ভাগ্যও ঘোর অমানিশায় পড়ে গেছে।
আরও পড়ুন : কেমন আছেন রোহিঙ্গারা?
একদিকে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের মাধ্যমে চীন ও ভারতের জন্য রাখাইনকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। ওদিকে বাংলাদেশ ‘মানবিক কারণে’ রোহিঙ্গাদের জন্য বর্ডার খুলে দিয়েছে।
এতে পোয়াবারো হয়েছে সেবার ছদ্মবেশে সাম্রাজ্যবাদের ক্রীড়ানক এনজিওগুলোর। তারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নামে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে দেদার পয়সা আনছে। সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করছে পশ্চিমা মদদপুষ্ট মিশনারি এনজিওগুলো। সাহায্যের নামে তারা শরণার্থী শিবিরে ধর্মান্তরের কাজ করছে অবাধে।
আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির কূটকৌশলে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন মহল কর্তৃক চীন ভারতের স্বার্থে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের বিনিময়ে গত ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বহু প্রশ্নের উদ্রেককারী নির্বাচনকে দু’দিনের মাথায় চীন ও ভারত সমর্থন করেছে এবং ‘পুনঃনির্বাচিত’ বাংলাদেশ সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছে। এর ফলে বলিরপাঠা হয়ে গেছে এদেশের জনগণ। মানুষের ভোট প্রয়োগের অধিকার সংকুচিত হয়ে গেছে। কিন্তু তিক্ত বাস্তবতা হলো, আঞ্চলিক দুই বৃহৎ শক্তি তথা চীন-ইন্ডিয়াকে ডিঙ্গিয়ে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ধ্বজাধারী সোলএজেন্ট ইউরোপ-আমেরিকা বাংলাদেশের অদ্ভুত নির্বাচনের ব্যাপারে বেশি কিছু বলছে না এবং আগামীতে কার্যকরী কোন পদক্ষেপ নিবে বলে মনেও হয় না।
আমাদের চোখের সামনে ঘটে চলা এই ভূ-রাজনৈতিক খেলা একটি তিক্ত বাস্তবতাকে আরো একবার সুস্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থের সামনে মানবতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার কোন মূল্যই রাখে না। নিজেদের হীনস্বার্থের জন্য তারা কোন জাতি অথবা দেশকে ধ্বংসের শেষপ্রান্তে পৌঁছে দিতে একটুও বিলম্ব করে না।
অবশ্য চীন এবং হিন্দুস্তানের সংখ্যালঘুরা সবসময়ই নির্যাতিত, নিপীড়িত নিগৃহীত। দুটি দেশের বর্তমান অবস্থা দেখলে এটি আরও স্পষ্ট হয়ে যায়। চীনে উইঘুর মুসলমানদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলার পর এখন ইসলাম পালনের ক্ষেত্রেও পদে পদে প্রকাশ্য প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হচ্ছে। কিন্তু কথা বলার কেউ নেই। কারণ বৃহৎ মুসলিম দেশ তথা পাকিস্তান বাংলাদেশ তুরস্ক মালয়েশিয়া একেক দেশকে চীন বিভিন্ন স্বার্থের বেড়াজালে একেকভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।
আরও পড়ুন : চীনে ইসলামের আগমন, উইঘুর মুসলিমদের ঐতিহ্য ও বর্তমান দুরবস্থা
ওদিকে রোহিঙ্গা নাটকের লাস্ট এপিসোড হিসেবে ইন্ডিয়া তার দেশে আশ্রয় নেওয়া ৩০ বা ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে বিতাড়নের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। অথচ হিন্দুস্তানকে এ প্রশ্ন করার নৈতিক সাহস কারোই নেই যে, মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশে কেনো পুশ করা হবে? আর আসাম থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে তাড়িয়ে দেওয়ার চক্রান্ত তো বহু আগে থেকেই চলছে। যার উদ্যোক্তা সে দেশের কট্টর হিন্দুত্ববাদী সরকার, আদালত এবং আইন শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনী সেই অমানবিক উদ্যোগ বাস্তবায়নকারী।
সার্বিক অবস্থাদৃষ্টে সর্বস্তরের জনগণের সচেতনতা এবং গণজাগরণ ব্যতীত অন্য কোন মাধ্যমে এ কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করা সম্ভব বলে মনে হচ্ছে না।
লেখক :আলেম ও রাজনীতিবিদ
